**নূন্যতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে রাজপথে পোশাকশ্রমিকেরা: গাজীপুর, আশুলিয়া ও রাজধানীতে অচলাবস্থা |**
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচের প্রেক্ষাপটে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে দেশের প্রধান প্রধান তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চলে তীব্র অসন্তোষ ও শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে | শনিবার দুপুরের পর থেকে গাজীপুর, সাভারের আশুলিয়া এবং রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক কারখানার কাজ ফেলে রাজপথে নেমে আসেন | শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে | পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর সহিংসতা এড়াতে কারখানা কর্তৃপক্ষগুলো তাৎক্ষণিকভাবে গাজীপুরের কোনাবাড়ী থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার এলাকার সব পোশাক কারখানাসহ আশুলিয়ার কাঠগড়া ও আশপাশের অন্তত ৩০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় | ফলে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন কার্যক্রমে এক আকস্মিক স্থবিরতা নেমে আসে |
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে আন্দোলনের তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান | শনিবার দুপুরের খাবার বিরতির পর কাজে যোগ না দিয়ে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সংলগ্ন একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট দাবিতে প্রথম বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন | মুহূর্তের মধ্যেই এই ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ পার্শ্ববর্তী অন্যান্য কারখানার হাজার হাজার শ্রমিকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা রাস্তায় নেমে সহকর্মীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন | একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা দলবদ্ধ হয়ে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক সম্পূর্ণ অবরোধ করে ফেলেন | মহাসড়ক অবরোধের ফলে ব্যস্ততম এই জাতীয় সড়কের উভয় পাশে শত শত যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও দূরপাল্লার যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয় এবং যান চলাচল পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে | তীব্র গরম ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয় | কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের সড়ক থেকে শান্তিপূর্ণভাবে সরিয়ে দিয়ে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য পুলিশ প্রশাসন দফায় দফায় আলোচনা ও বোঝানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় |
অন্যদিকে দেশের আরেকটি প্রধান তৈরি পোশাক হাব সাভারের আশুলিয়াতেও একই দাবিতে সকাল থেকেই চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল | সেখানে ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি কোনো কারণ ছাড়া শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা এবং কালোতালিকাভুক্ত বা ব্ল্যাকলিস্ট করার অমানবিক প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ করার জোরালো দাবি তোলা হয় | আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় অবস্থিত ‘নাঈম নিটওয়্যার’ কারখানার অভ্যন্তরে সকালবেলা কর্মবিরতি পালনের মধ্য দিয়ে মূলত এই অসন্তোষের সূত্রপাত ঘটে | পরবর্তীতে উত্তেজিত শ্রমিকেরা কারখানার চত্বর ছেড়ে বাইরে এসে আশপাশের অন্যান্য পোশাক কারখানার ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করেন | পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শিল্প পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় | এ সময় বিক্ষোভকারীদের দিক থেকে ধেয়ে আসা ইটপাটকেলের সরাসরি আঘাতে দায়িত্বরত এক শিল্প পুলিশ সদস্য মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয় |
আশুলিয়ার অস্থিতিশীল পরিবেশের বিবরণ দিয়ে আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান যে, শ্রমিকদের বিক্ষোভ অন্যান্য কারখানায় ছড়িয়ে পড়া এবং জানমালের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর স্বার্থেই কাঠগড়া ও আশপাশের অন্তত ৩০টি কারখানায় আগাম ছুটি দিতে মালিকপক্ষ বাধ্য হয়েছে | পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিশমাইল-জিরাবো সংযোগ সড়কে সব ধরনের গণপরিবহন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং চালকেরা নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যান | এদিকে আইনশৃঙ্খলার এই টানটান উত্তেজনার মধ্যেই দুপুরের দিকে আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থিত নাসা গ্রুপের কারখানার সামনের রাস্তা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় তিনটি ককটেলসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ | জনবহুল ও স্পর্শকাতর এই শিল্পাঞ্চলে ককটেলসদৃশ বস্তু পাওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা ও নজরদারি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয় |
শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার অভ্যন্তরেও তৈরি পোশাকশ্রমিকদের এই বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন ব্যাপক প্রভাব ফেলে | রাজধানীর মিরপুর এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার কয়েক শত শ্রমিক সকাল পৌনে এগারোটার দিকে রাজপথে নেমে এসে ব্যারিকেড তৈরি করেন | পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিনের তথ্যমতে, শ্রমিকেরা মিরপুরের প্রধান প্রধান মোড় ও সংযোগ সড়কগুলোতে অবস্থান নিলে পুরো মিরপুর এলাকায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে বন্ধ হয়ে যায় | টানা প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধ চলার পর দুপুর আড়াইটার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকা থেকে শ্রমিকেরা সাময়িকভাবে সরে গেলে সেখানে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে | তবে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মিরপুর সাড়ে এগারো ও কালশী সড়কের বিভিন্ন অংশে শ্রমিকদের অবস্থান ও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে | মিরপুরের এই আন্দোলনে পুলিশের সাথে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ সংঘাতের ঘটনা না ঘটলেও সাধারণ নাগরিকেরা চরম যাতায়াত দুর্ভোগে পড়েন |
বিক্ষোভকারী শ্রমিকেরা তাঁদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অর্থনৈতিক সংকটের কথা অকপটে প্রকাশ করেছেন | আন্দোলনরত কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান বাজারে চাল, ডাল, তেলসহ প্রতিটি নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে বর্তমান বেতনে মাসের অর্ধেক দিনও সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে | ঘরভাড়া, সন্তানের লেখাপড়া এবং চিকিৎসা খরচের বাড়তি চাপ বহন করতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত দেনার দায়ে জর্জরিত হচ্ছেন | মালিকপক্ষের মৌখিক আশ্বাস বা কালক্ষেপণে তাদের আর কোনো ভরসা নেই | এক সাধারণ পোশাককর্মী আক্ষেপ করে জানান যে, মালিকপক্ষ তাদের বিদেশি বায়ার, বিজিএমইএ এবং সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বেতন বাড়ানোর আলোচনা চলার কথা বলে শান্ত থাকতে বললেও মুখে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকে না | অতীতেও এমন বহু আশ্বাস দেওয়া হলেও শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি | তাই সরকারিভাবে সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা না আসা পর্যন্ত রাজপথের দাবি আদায়ে তারা অনড় থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন |
শ্রমিক অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ এই পরিস্থিতির জন্য সরকারের পূর্বনির্ধারিত প্রতিশ্রুতি যথাসময়ে পূরণ না করাকেই প্রধানত দায়ী করছেন | বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটারস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন উল্লেখ করেন যে, ৩০ হাজার টাকা নূন্যতম মজুরি নির্ধারণের দাবিটি শ্রমিকদের জীবন বাঁচানোর তাগিদ থেকেই উঠে এসেছে | এছাড়া তুচ্ছ কারণে কারখানা থেকে ছাঁটাই এবং অন্য কোথাও যাতে চাকরি না পায় সেজন্য অনৈতিকভাবে কালোতালিকাভুক্ত করার চর্চা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না | তিনি জানান, শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে ইতিপূর্বে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে অক্টোবর মাসের মধ্যেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন সম্পন্ন হবে | কিন্তু সেই নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে চরম আস্থাহীনতা ও ক্ষোভের জন্ম নেয় | যদিও শুক্রবার রাতে শ্রম মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দ্রুততম সময়ে মজুরি বোর্ডের কাজ শুরু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি যথাসময়ে কারখানাগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ শ্রমিকদের কাছে কার্যকরভাবে না পৌঁছানোর কারণেই এই আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটেছে |
শিল্প খাতের এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও জরুরি পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে | শনিবার বিকেলে রাজধানীর তোপখানা রোডের শ্রম ভবনে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ দুই সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান যে, তৈরি পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক সরকারি গেজেট রবিবার প্রকাশ করা হবে | মন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, সরকার শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রতি অত্যন্ত সচেতন এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে মজুরি কাঠামোর পুনর্বিন্যাস সম্পন্ন করা হবে | একই সাথে দেশের বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই রপ্তানিমুখী খাতের উৎপাদন চাকা সচল রাখতে সব ধরনের সড়ক অবরোধ ও সংঘাত পরিহার করে শ্রমিকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি |
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত পোশাক শিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক শক্তিশালী স্তম্ভ এবং এই শিল্পের প্রকৃত কারিগর হলেন লাখ লাখ পরিশ্রমী সাধারণ শ্রমিক | বর্তমান চরম মূল্যস্ফীতির সময়ে বেঁচে থাকার মতো একটি সম্মানজনক ও ন্যূনতম মজুরির দাবি যেমন সম্পূর্ণ মানবিক ও বাস্তবসম্মত, তেমনি সহিংসতার পথ বেছে নিয়ে শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়াও কোনো পক্ষের জন্যই মঙ্গলজনক হতে পারে না | তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজার টিকিয়ে রাখা এবং একই সাথে খেটে খাওয়া মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সরকারের যৌথ ঐকমত্য এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি | আসন্ন মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের যৌক্তিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং শিল্পাঞ্চলে কাজের একটি সুষ্ঠু ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব |