বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের পর এবার তার কন্যা জাইমা রহমানকে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় করার বিষয়টি দলের নতুন কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দলটিতে বর্তমানে তার কোনো আনুষ্ঠানিক পদ না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার উপস্থিতি ও কার্যক্রম দলীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
কৌশলগত অবস্থান ও লক্ষ্য বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর সপরিবারে দেশে ফেরার পর থেকে জাইমা রহমানকে ধাপে ধাপে ও পরিকল্পিতভাবে সামনে আনা হচ্ছে। এর পেছনে বিএনপির একাধিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে:
১. নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা: জাইমাকে সামনে এনে বিএনপি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বার্তা দিতে চাইছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে তিনি দলের হাল ধরতে পারেন।
২. তরুণ ও নারী ভোটার: ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্ম এবং নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে জাইমা রহমানকে ‘আধুনিক ও শিক্ষিত’ মুখ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
৩. রাজনৈতিক ভারসাম্য: জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনায় রেখে, ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদের বিপরীতে বিএনপির প্রগতিশীল অবস্থান তুলে ধরতেই জাইমাকে সামনে আনা হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শিক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবন
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমানের জন্ম ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায়। বারিধারার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সেখানে ম্যারি মাউন্ট গার্লস স্কুল এবং কুইন মেরি ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে ইনার টেম্পল থেকে বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন।
গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি আইন পেশার প্রতি নিজের আগ্রহের কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, মানুষের জীবনের গল্প এবং তার আইনি সমাধান খোঁজার দায়িত্ব তাকে অনুপ্রাণিত করে। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বাবা-মায়ের সঙ্গে তিনি দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফেরেন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততা
আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও জাইমা রহমান বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
গত নভেম্বরে ইউরোপভিত্তিক প্রবাসী ভোটারদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভায় অংশগ্রহণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’-এ তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান।
দেশে ফেরার পর গত ১৮ জানুয়ারি ‘উইমেন শেপিং দ্য নেশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য প্রদান।
নিজের লেখা ‘নিজের গল্প’-এ তিনি উল্লেখ করেছেন, গত গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি নেপথ্যে থেকে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন এবং দেশে ফিরে বাবাকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চান।
বিশ্লেষকদের মতামত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র নতুন কিছু নয়। বিএনপির সমর্থকরা এই পরিবারকে কেন্দ্র করেই রাজনীতি করেন। তাই মনে হচ্ছে, জাইমা রহমানকে ধীরে ধীরে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।”
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশ্লেষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, “পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ নারী হিসেবে জাইমা রহমানকে সামনে এনে বিএনপি জেন-জি ও নারী ভোটারদের বিশেষ বার্তা দিতে চাইছে। এটি মৌলবাদের বিপরীতে দলের অবস্থান স্পষ্ট করারও একটি কৌশল। তবে তিনি নেতৃত্বে কতটা সফল হবেন, তা সময়ই বলে দেবে।”