বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:১৬ অপরাহ্ন

কাজ ও পরিবারের ভারসাম্য: অভিজ্ঞতা থেকে ১০টি পরামর্শ

বাদল সৈয়দ / ১ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

১) সমুদ্রের তীর থেকে ভেসে আসা দীর্ঘশ্বাস…
আমার বন্ধুটির কর্পোরেট ক্যারিয়ার সৌভাগ্যের আলোয় উদ্ভাসিত। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় শীর্ষে পৌঁছেছে। তার সর্বশেষ অফিস ছিল ইউরোপে। সেখান থেকে অবসরে গেছে। এখন সেখানেই সমুদ্রপাড়ে অতি মনোরম বাংলোয় অবসর জীবন কাটাচ্ছে।
আমি কয়েক দিন আগে তাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দোস্ত, তুমি তো ক্যারিয়ারে সব পেয়েছ। তোমার কি কোনো অতৃপ্তি আছে?’
সে বলল, ‘দোস্ত, এটা ঠিক ক্যারিয়ারে যত গোল্ড কয়েন পাওয়া সম্ভব, আমি সেগুলোর প্রায় সব পেয়েছি।‘
বলতে বলতে সে একটু থমকে গেল, তারপর ফোনে যেন হালকা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো, ‘তবে দোস্ত, এ প্রাপ্তির জন্য আমাকে বড় একটি স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে। তা হচ্ছে, আমি আমার বাচ্চাদের বড় হওয়া দেখিনি। এত বেশি ব্যস্ত ছিলাম, ব্যাপারটা ঠিকভাবে নোটিশই করিনি। যখন সময় হলো তখন বাড়ি শূন্য। ওরা বড় হয়ে গেছে। কাজেকর্মে ছড়িয়ে পড়েছে।‘
২) কাজ এবং পরিবারের ভারসাম্য…
পেশাগত কাজ এবং পরিবারকে সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা খুব কঠিন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা তা বজায় রাখতে পারি না। কিন্তু একটু সচেতন হলে এ ভারসাম্য পুরোপুরি না হলেও মোটামুটি বজায় রাখা সম্ভব।
কীভাবে?
চলুন দেখি-
ক) পারতপক্ষে অফিসের কাজ অফিসেই সারুন। বাসায় নেবেন না। যখনই বাসায় ফিরুন, ওই সময়টি কেবল পরিবারের।
খ) ফ্যামিলি টাইম ঠিক করুন। আমাদের অফিস টাইম আছে, ফ্যামিলি টাইম নির্ধারিত নেই।
আপনার ব্যস্ততা অনুসারে ফ্যামিলি টাইম ঠিক করুন। কারও তা দুই ঘণ্টা হতে পারে, কারও চার ঘণ্টা। যেটাই হোক সেটা ফিক্স করুন এবং নিয়মিত অনুসরণ করুন। একটু চেষ্টা করলে এটা সম্ভব।
গ) প্রতি সপ্তাহে একটি ফ্যামিলি ক্যালেন্ডার ঠিক করুন। এর মানে হলো, সপ্তাহের কোন দিন পরিবারকে কীভাবে সময় দেবেন তা ঠিক করুন।
পরিবারের সদস্যদের বিশেষ দিনে ওদের সাথে থাকুন। সম্ভব হলে তা উদযাপন করুন।
ঘ) ‘সময় পেলে পরিবারকে দেব’ – এই মাইন্ডসেট থেকে বের হয়ে এসে ‘কাজ শেষে অবশ্যই পরিবারকে সময় দেব’-এই মাইন্ডসেট তৈরি করুন।
ঙ) কাজের প্রায়োরিটি ঠিক করুন। যে কাজ আজ না করলেও চলবে তা করে পরিবারকে বঞ্চিত করবেন না। কালকের কাজ কাল করুন, আজ পরিবারকে সময় দিন।
চ) ছুটির দিনে পরিবারকে সময় দিয়ে অন্য সময় কম দেওয়ার ব্যাপারটি পুষিয়ে দিন।
ছ) সম্ভব হলে বাচ্চাকে স্কুলে নিজেই পৌঁছে দিন। ওকে স্কুল থেকে আনার সময় হয়তো আপনি কাজে থাকবেন, কিন্তু ভোরে অফিসে যাওয়ার আগে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করা যায়।
জ) বাড়িতে কিছুক্ষণ ‘নো অফিস টাইম’ রাখুন। এ সময় অফিসিয়াল ইমেইল, মেসেজ এগুলো দেখবেন না।
ঝ) শুধু বাড়িতে থাকলেই হবে না-পরিবারকে কোয়ালিটি টাইম দিন। বাড়িতে থাকলেন, কিন্তু সময় কাটালেন মোবাইল বা টিভি দেখে তাহলে লাভের খাতা শূন্য হবে।
ঞ) অন্তত রাতের বেলা একসঙ্গে খাবার খান। ডাইনিং টেবিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক মিলনকেন্দ্র।
৩) আমার দীর্ঘশ্বাস…
আমি কাজ ও পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য রাখার এত উপদেশ দিলাম, কিন্তু আমি নিজে কি তা পেরেছি?
আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ফ্যামিলিকে সময় দেওয়া নিয়ে তুমি বা আমাদের মেয়ে কি আমার ওপর সন্তুষ্ট?’
সে নিজের ব্যাপারে কিছু না বলে বলল, ‘তোমার মেয়ের এ ব্যাপারে হয়তো কিছুটা অভিমান আছে।‘
মেয়েকে আমরা ডাকি, ‘বাবু’।
আমি বললাম, ‘আমি তো প্রায় সবসময় অফিসের পর তোমাদের সাথে ছিলাম। তাহলে বাবুর অভিমান কেন?’
আমার স্ত্রী উত্তর দিলো, ‘হ্যাঁ, তুমি বাসায় ছিলে। কিন্তু ও যখন বড় হচ্ছিল, তখন তুমি বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলে। সাথে ছিল লেখালেখি। তুমি বেশিরভাগ সময় বাসায় থেকেই কাজগুলো করতে, কিন্তু তাতে ওর দিকে মনোযোগ কম দিতে পেরেছ। তাই ওর কিছুটা অভিমান থাকাটা অস্বাভাবিক নয় ।’
আমি মন খারাপ করে চুপ করে রইলাম।
আমার স্ত্রী বলল, ‘মন খারাপ করো না। আমি ওকে বুঝিয়েছি, ওই সময় তোমার বাবা মানুষকে সাহায্য করার জন্য কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলায় ব্যস্ত ছিল। ও একা নয়, ওরা অনেকেই কাজটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
তাতে বাবার সঙ্গ থেকে তুমি কিছুটা বঞ্চিত হয়েছ, এটা সত্যি, তবে কাজগুলো করারও দরকার ছিল।’
বলতে বলতে আমার স্ত্রী একটু থামল, তারপর মমতা নিয়ে বলল, ‘আমার ধারণা সে ব্যাপারটি বুঝেছে। নয়ত তোমাদের কাজগুলোকে ও ভালোবাসত না।’
তারপরও আমার মনের খচখচ ভাবটা গেল না।
মেয়েটা কখন বড় হয়ে গেল, টের পেলাম না…
#আসুন মা য়াছড়াই


এ জাতীয় আরো খবর...