এসএসসি পাশ করেছি। রেজাল্ট খুব ভালো হয়েছে। বাসায় আনন্দের বন্যা বইছে।
কয়েক দিন পর বাবা একদিন অফিস থেকে ফিরে বললেন, ‘আজ বিকেলে খেলতে যেও না। তোমাকে এক বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে যাব।’
আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আজ আমাদের দলের মধ্যে দুই গ্রুপ হয়ে বাজি ধরে ম্যাচ খেলার কথা। যে দল হারবে তারা বিজয়ী দলকে বাটার বন খাওয়াবে।
এ রকম একটি দুর্দান্ত ম্যাচ ছেড়ে কার মন চায় বাবার বন্ধুর বাড়ি যেতে? কিন্তু বাবার কথা ফেলার সাহস আমার নেই। তাছাড়া, এত্ত আদর করে বলেন!
আমি নিমপাতা গেলার মতো ভঙ্গি করে বললাম, ‘কোন বন্ধুর বাড়ি, আব্বা?’
তিনি মুচকি হাসলেন। কিছু বললেন না। আমি মুখ গোমড়া করে রেডি হলাম। বিকেলে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনির বাইরে একটা দোতলা লাল বাংলোর সামনে দাঁড়ালাম।
বাবা কিছুটা সংকোচ নিয়ে বেল বাজালেন। বোঝা যাচ্ছে, তিনি এ বাড়িতে আসায় অভ্যস্ত নন। তাই একটু বিব্রত। সম্ভবত গৃহকর্তা কীভাবে নেন, সে চিন্তায়।
একটু পর শব্দ করে গেট খুলে গেল। হাফহাতা সাদা গেঞ্জি পরে যে ভদ্রলোক গেটের ওপারে দাঁড়িয়ে, তাঁকে দেখেই বোঝা যায় অভিজাত মানুষ। কিন্তু তাঁর নিজের গেট খোলা মানাচ্ছে না। এ ধরনের মানুষেরা সাধারণত নিজে গেট খোলেন না।
বাবা তাঁকে দেখে একটু কুণ্ঠিত হাসি হাসলেন। ভদ্রলোক একটু থমকে দাঁড়িয়ে দুহাত বাড়িয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আরে তাহের, ওল্ড গুড জলি ফেলো, তুমি কোত্থেকে? তোমাকে তো দেখাই যায় না।’
বাবা আলিঙ্গন ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘আজ আমার বিশেষ দিন, তাই এসেছি। অন্যদিন তোমাকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে করে না। তুমি ব্যস্ত মানুষ।’
ভদ্রলোক আমাদের বাড়ির ভেতর নিয়ে গেলেন। ছিমছাম বাড়ি, কিন্তু রুচির অভাব নেই।
বাবা আমার রেজাল্টের কথা বললেন। তাঁর চেহারায় তৃপ্তি। কথা শেষ হতেই সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘বাবার মান রেখেছ বেটা। তোমার বাবা কিন্তু অনেক মেধাবী মানুষ। আমি আর তিনি যখন এক রুমে থাকতাম, তাঁর জ্ঞানের ধার দেখে মুগ্ধ হতাম। তোমাকে এ ধার বজায় রাখতে হবে। তাহলে অনেক দূর যাবে।’
ভদ্রলোকের নাম মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি ছিলেন ইনকাম ট্যাক্স কমিশনার। সেই লাল বাড়িটিতে থাকতেন।
কিছুক্ষণ পর আমরা বাপ-বেটা উষ্ণ আতিথেয়তা শেষে মেজবাহ সাহেবের বাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আব্বা, আমাকে ওনার কাছে কেন নিয়ে এসেছেন?’
বাবা বললেন, ‘চাকরির শুরুতে আমি আর মেজবাহ ব্যাচেলর অবস্থায় একই রুমে থাকতাম। কিন্তু আমি তার মতো হতে পারিনি। আমি চাই তুমি ওর মতো হও। একদিন ওই লাল বাড়িটিতে তুমিও থাকো। তাই তোমাকে এখানে আনা, যাতে তুমি বুঝো আমি কী চাই।’
তেত্রিশ বছর পর, ঠিক আজকের দিনে, আমি ওই বাড়িটিতে থাকার যোগ্যতা লাভ করি। ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট আমার ইনকাম ট্যাক্স কমিশনার হিসেবে প্রমোশন হয়।
তারপর দীর্ঘ দশ বছর কেটে গেছে। আমি আরও দুটো প্রমোশন পেয়ে সর্বোচ্চ গ্রেডে পৌঁছেছি। কিন্তু বাবার স্বপ্নপূরণের সেই প্রমোশনের আনন্দ আর কখনো পাইনি।
এ জাতীয় আরো খবর...