১ ) একজন ভদ্রমহিলা। ব্যারিস্টারি পড়লেও পেশাজীবনে তিনি শিল্প উদ্যোক্তা। বিভিন্ন সময় ইন্টারভিউ বা টকশোতে তাঁকে দেখি। গর্বে আমার বুক ফুলে যায়। কারণ আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন তাঁকে কয়েক বছর পড়িয়েছিলাম। তাই শিক্ষক হিসেবে আমার গর্বিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক।
২ ) আমার মেয়ে স্কুলে পড়ার সময় অঙ্কে খুব দুর্বল ছিল। তার অঙ্কভীতি ছিল মারাত্মক। খবর পেলাম একজন ছাত্র অঙ্কে খুব ভালো। তিনি তা অন্যদের খুব ভালোভাবে বোঝাতেও পারেন। আমি তাকে অনুরোধ করলাম আমার মেয়েকে অঙ্ক করাতে। তিনি পড়ানো শুরু করার পর মেয়ে অঙ্কের দুর্বলতা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠল। এখন তার অঙ্কভীতি নেই।
গৃহশিক্ষক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা আছে। আবার সন্তানের জন্য গৃহশিক্ষক বাছাই করার অভিজ্ঞতাও আমার আছে।
তাই গৃহশিক্ষক নির্বাচনে কী কী বিষয় খেয়াল রাখা উচিত তা আমি কিছুটা বুঝি। একইভাবে গৃহশিক্ষকরা কী ধরনের আচরণ আশা করেন সে ব্যাপারেও আমার ধারণা আছে।
এই দুই অভিজ্ঞতা থেকে নিচের লেখাটি লিখলাম।
১ ) পরিচিত কারো মাধ্যমে গৃহশিক্ষক রাখলে তাঁর ব্যাপারে আগে থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
২ ) গৃহশিক্ষক নির্বাচনে তাঁদের স্বভাব-চরিত্র অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত। আমাদের সন্তান তাঁদের সাথে বড় একটি সময় কাটায়, তাই তাদের চরিত্র গঠনে এসব শিক্ষকের বড় একটি ভূমিকা থাকে।
৩ ) যদি কোনো ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষক হিসেবে রাখা হয় তবে তিনি ছাত্র হিসেবে ভালো কিনা তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভালো ছাত্রের সংস্পর্শ সন্তানের শিক্ষাজীবনে খুব ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৪ ) শিক্ষক হিসেবে তিনি কতটুকু নিয়মানুবর্তী এবং সময়ানুবর্তী এটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অন্যসব গুণ থাকার পরেও তিনি যদি নিয়মিত ও সময়মতো পড়াতে না আসেন কোনো লাভ হবে না।
৫ ) বদরাগি গৃহশিক্ষক শিশুর মধ্যে পড়াভীতি তৈরি করে।
৬ ) কিছুদিন তাঁর বোঝানোর সক্ষমতা (Teaching ability) পর্যবেক্ষণ করুন। তা না থাকলে তাঁকে রাখা ঠিক হবে না। আমার মেয়ের অঙ্ক শিক্ষকের এ গুণ ছিল বলে তিনি তার অঙ্কভীতি কাটাতে পেরেছিলেন।
খ ) গৃহশিক্ষকদের প্রতি ব্যবহার:
১) অবশ্যই মাসের প্রথম সপ্তাহে তাঁদের বেতন পরিশোধ করুন।
২) যদি কোনো কারণে তাঁকে বিদায় করতে হয় তবে ভদ্রভাবে পুরো পাওনা পরিশোধ করুন।
আমি এক বাসায় পড়াতাম। খুব স্বচ্ছল। একদিন তাঁরা না জানিয়ে, আমার পাওনা না দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে গেলেন। টাকা না পাওয়ার ব্যাপারটি আমি ভুলে গিয়েছি। কিন্তু কোনো কিছু না বলে চলে যাওয়ার ব্যাপারটা এখনো আমাকে রাগান্বিত করে তোলে। তাঁদের টাকা-পয়সার অভাব ছিল না। অভাব ছিল গৃহশিক্ষকের প্রতি সম্মানবোধের। হয়তো তাকে যে বেতন দেওয়া হয়নি, এটি তাঁদের মনেই ছিল না!
৩) তাঁর প্রতি অসম্মানজনক ব্যবহার করবেন না। কিছু বলতে হলে ভদ্রভাবে বলুন। তাও ছাত্রের সামনে না বলে আলাদাভাবে বলুন।
৪) সম্ভব হলে তাঁকে আপনার সামর্থ্যের মধ্যে আপ্যায়ন করবেন।
৫) রেজাল্ট খারাপ হলে সরাসরি তাঁকে দায়ী না করে ভবিষ্যতে কীভাবে রেজাল্ট ভালো করা সে ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে আলাপ করুন।
৬ ) আমি এক বাসায় পড়াতাম। মাস শেষে খামে ভরে তাঁরা আমার পারিশ্রমিক দিতেন। সে খামে ছোট্ট একটি নোট থাকত। তাতে লেখা থাকত কেবল একটি শব্দ -‘ধন্যবাদ’।
ধন্যবাদ শব্দটির শক্তি অনেক। দয়া করে তা মনে রাখবেন।
আমার মেয়েকে কয়েকজন গৃহশিক্ষক বিভিন্ন সময়ে পড়িয়েছেন। তার জীবনে তাঁরা প্রত্যেকে ছিলেন একেকটি নক্ষত্র। তাঁদের ঋণ শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু তাঁদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি।
এ জাতীয় আরো খবর...