১) জ্বর এবং অপ্রত্যাশিত ভিজিটর
২০০০ সাল।
আমি তখন ঢাকায় কর বিভাগের ডেপুটি কমিশনার হিসেবে কর্মরত। আমার ইমিডিয়েট বস ছিলেন একজন জয়েন্ট কমিশনার। একদিন আমার প্রচণ্ড জ্বর হলো। তাই অফিসে গেলাম না। ছুটির অ্যাপ্লিকেশন পাঠিয়ে দিলাম।
বেলা এগারোটার দিকে একজন জুনিয়র অফিসার আমাকে দেখতে এলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কেন এসেছেন?’
তিনি আমতা আমতা করতে লাগলেন, তারপর একসময় বলে ফেললেন, ‘জয়েন্ট কমিশনার স্যার আপনি আসলে অসুস্থ কিনা তা দেখতে পাঠিয়েছেন।‘
জ্বরে আমার শরীর এমনিতেই কাঁপছিল, তাঁর কথা শুনে রাগে সে কাঁপুনি আরো বেড়ে গেলো।
সুস্থ হয়ে আমি তৎকালীন কমিশনার অসীম কুমার রায় স্যারকে ব্যাপারটি জানিয়ে অনুরোধ করলাম, আমাকে অন্য কোনো জয়েন্ট কমিশনারের অধীনে বদলি করার জন্য। স্যার আমার অনুরোধ রাখলেন।
কারণ হচ্ছে, কয়েকদিন আগে অফিস পলিটিক্স নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। সেটাতে বলেছিলাম ইমিডিয়েট বসের সাথে সুসম্পর্ক রাখলে সমস্যা কম হয়। সেটা পড়ে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, ইমিডিয়েট বস নিজেই যদি ভালো না হন তখন কী করা উচিত?
সে প্রেক্ষিতে নিজের ইমিডিয়েট বসের সঙ্গে বাজে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিলাম। কিন্তু তাতে প্রশ্নকর্তাদের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। সবাই আমার মতো সৌভাগ্যবান নন যে চাইলেই ইমিডিয়েট বস চেঞ্জ করতে পারবেন।
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, যারা প্রশ্ন করেছেন তাঁদের অনেকেই কর্পোরেট চাকরি করেন। শুধু সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা দিয়ে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ঠিক হবে না। সেজন্য আমি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব, আমার ছোটোবেলার বন্ধু সুবেহ খানের সাথে ব্যাপারটি নিয়ে আলাপ করলাম।
দুজনের ভাবনা মিলিয়ে এ সমস্যার কিছু সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করা হলো।
ক) মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। বস খারাপ ব্যবহার করলে তাৎক্ষণিক রিয়্যাক্ট করবেন না। তাতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
খ) খেয়াল করুন তাঁর স্বভাবই এরকম কিনা? সবার সাথে তিনি এরকম আচরণ করেন কিনা? যদি দেখেন শুধু আপনার সাথেই খারাপ ব্যবহার করেন, আর কারো সাথে নয়, তবে হয়তো আপনার কোনো সমস্য আছে। আপনার কোন ত্রুটি তাঁর বিরক্তির কারণ খুঁজে বের করুন। তারপর তা দূর করার দিকে মনোযোগ দিন।
গ) সুবেহ যখন হংকংয়ে পোস্টেড ছিল তখন তার লাইন বস তার সাথে ভালো ব্যবহার করতেন না। সে খেয়াল করে দেখল, বস নিজের কিছু পেশাগত অদক্ষতার কারণে টপ ম্যানেজমেন্টকে সন্তুষ্ট করতে পারেন না। তাই নিজের ব্যর্থতার ঝাল জুনিয়রের ওপর ঝাড়তেন।
ব্যাপারটি বুঝতে পেরে সে বসকে নির্ভুল বিশ্লেষণ, ব্যবসার সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করতে লাগল। যা বসের পারফরম্যান্স ভালো করার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।। ফলে ধীরে ধীরে সুবেহের প্রতি তাঁর বিরাগভাব কেটে গেলো। তিনি তাকে পছন্দ করা শুরু করলেন।
দক্ষতাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কোনো বসের নেই।
ঘ) বসের ব্যক্তিগত আগ্রহগুলো জানতে পারলেও অনেক সময় উপকার হয়। কাজের বাইরে কোনো ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ থাকলে তা নিয়ে মাঝে মাঝে আলাপ করতে পারেন। যেমন, খেলাধুলা। তবে তা যেন তোষামোদে পরিণত না হয়।
তোষামোদকারীরা দিনশেষে সুপারি গাছে পরিণত হয়। যেদিকে বাতাস সেদিকে দোলে। ব্যক্তিত্ব বলে কিছু থাকে না।
ঙ) বসের কোনো আচরণের প্রতিবাদ প্রকাশ্যে করলে তিনি আরো অ্যারোগ্যান্ট হয়ে যান। তাই এ ব্যাপারে একান্তে তাঁর সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলুন। আপনার দক্ষতা উন্নয়নে তাঁর পরামর্শ চান। সে পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলে তিনিও সন্তুষ্ট হবেন, আপনার দক্ষতাও বাড়বে।
চ) কখনোই অন্যের কাছে বসের নিন্দা বা সমালোচনা করবেন না। এ নিন্দার কথা তাঁর কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুব বেশি। তখন তিনি আরো ক্ষিপ্ত হবেন। তবে এ ব্যাপারে শুভাকাঙ্ক্ষী সহকর্মী বা অন্য কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তির সাথে একান্তে পরামর্শ করতে পারেন।
জ) বসের অযৌক্তিক প্রত্যাশা বাড়াবেন না। এতে তাঁর দাবি বাড়বে। কতটুকু পর্যন্ত আপনার কাছে আশা করা যাবে সে ব্যাপারে আগেই ধারণা দিয়ে রাখুন। নয়তো প্রত্যাশার চাপে পুড়ে মরবেন।
ঝ) নারী কর্মীরা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা হয়রানির শিকার হলে সাথে সাথে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানান। এগুলো একবার সহ্য করলে দিন দিন তা বাড়বে।
শুরু করেছিলাম বসের সাথে তিক্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে। শেষ করব মধুর অভিজ্ঞতা দিয়ে।
আমার এক বস, তাঁর নাম, জহির মোহাম্মদ। চাকরিজীবনের একদম শুরুতে একবার কাজে ভুল করলে তিনি গভীর মমতা নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আমার আন্ডারে আইনস্টাইনকে চাই না। আমি চাই তাকে, যাকে দিয়ে কাজ হবে। মনে রাখবে, সব বস এটাই চান।’
ছোট্ট একটি কথা- কিন্তু কর্মজীবনের অনেক সমস্যার সমাধান এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
এ জাতীয় আরো খবর...