ইতালিয়ান ফুটবলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার এবং এসি মিলানের সর্বকালের অন্যতম কিংবদন্তি ফ্রাঙ্কো বারেসি আর নেই। ৬৬ বছর বয়সে তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ইতালির ফুটবল অঙ্গনে। শুধু এসি মিলান নয়, বিশ্ব ফুটবলও হারাল এমন এক ব্যক্তিত্বকে, যিনি কয়েক দশক ধরে নেতৃত্ব, নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হয়ে ছিলেন।
বারেসির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর গভীর শোক প্রকাশ করেছে এসি মিলান। ক্লাবের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বারেসির বিদায়ে মিলানের ইতিহাস আজ শোকাহত। তার আদর্শ, ব্যক্তিত্ব এবং কিংবদন্তি ৬ নম্বর জার্সি চিরকাল ক্লাবের পরিচয় ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে এই কঠিন সময়ে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে ক্লাব এবং বিশ্বের কোটি কোটি রোসোনেরি সমর্থক।
গত বছর ফুসফুসে একটি নডিউল ধরা পড়ার পর অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল বারেসিকে। এরপর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আবারও জনসমক্ষে দেখা দিয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি সান সিরো স্টেডিয়ামেও উপস্থিত ছিলেন এই কিংবদন্তি। এমনকি ২০২৬ সালের মিলান-কোর্তিনা শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অলিম্পিক মশাল বহনকারীদের একজন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ে আর জয়ী হতে পারলেন না তিনি।
ফ্রাঙ্কো বারেসির নাম উচ্চারিত হলেই সামনে আসে এসি মিলানের এক গৌরবময় অধ্যায়ের ছবি। পুরো পেশাদার ক্যারিয়ার তিনি কাটিয়েছেন এক ক্লাবেই। মিলানের জার্সিতে খেলেছেন ৭১৯টি ম্যাচ, যা দীর্ঘদিন ক্লাবের অন্যতম সেরা রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ছয়টি সিরি আ শিরোপা এবং তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ বা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্বাদ পান তিনি। ইতালির জাতীয় দলের হয়েও খেলেছেন ৮১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ১৯৮২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি দলের সদস্য ছিলেন তিনি, যদিও সেই আসরে মাঠে নামার সুযোগ হয়নি।
বারেসির জীবনের গল্প শুধু একজন সফল ফুটবলারের নয়, প্রতিকূলতা জয় করে কিংবদন্তি হয়ে ওঠারও গল্প। ইতালির ব্রেসিয়া প্রদেশের ছোট্ট শহর ত্রাভালিয়াতোতে তার ফুটবলযাত্রার শুরু। স্থানীয় ক্লাব ইউনিওনে স্পোর্তিভা ওরাতোরিও দি ত্রাভালিয়াতোতে শৈশবের অনুশীলন থেকেই নজর কাড়তে শুরু করেন। কিন্তু মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবা-মাকে হারানোর মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। সেই দুঃসময় কাটিয়ে ১৯৭৪ সালে এসি মিলানের যুব একাডেমিতে যোগ দেন তিনি। এরপর সেই ক্লাবই হয়ে ওঠে তার আজীবনের ঠিকানা।
বারেসির ফুটবলজীবনের শুরুটাও ছিল নাটকীয়। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন ইন্টার মিলানের সমর্থক। কিন্তু শারীরিক গড়ন দুর্বল হওয়ায় ইন্টার তাকে দলে নেয়নি। অন্যদিকে তার বড় ভাই বেপ্পে বারেসি যোগ দিয়েছিলেন ইন্টারের একাডেমিতে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে ক্লাব তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, সেই ক্লাবেরই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানে নিজের কিংবদন্তি ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন তিনি। মিলানের যুব দলের কোচ ইতালো গালবিয়াতি তার অসাধারণ দক্ষতা চিনে নিয়ে দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যা বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ।
শান্ত স্বভাব, সোনালি চুল আর ক্ষীণদেহী গড়নের কারণে প্রথম দেখায় অনেকেই তাকে হালকাভাবে নিতেন। কিন্তু মাঠে নেমে তার নিখুঁত ট্যাকল, অসাধারণ পজিশনিং এবং খেলার বুদ্ধিমত্তাই প্রতিপক্ষকে বুঝিয়ে দিত, তিনি কতটা ভিন্ন মানের ফুটবলার। মিলানের ম্যাসাজ থেরাপিস্ট মারিকোন্তি তাকে স্নেহ করে ডাকতেন ‘পিসচিনিন’, মিলানিজ উপভাষায় যার অর্থ ‘ছোট্ট ছেলে’। এই ডাকনামই পরে তার পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।
১৯৭৮ সালের ২৩ এপ্রিল সুইডিশ কোচ নিলস লিডহোমের অধীনে সিরি আ-তে অভিষেক হয় বারেসির। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি প্রথম একাদশের অবিচ্ছেদ্য সদস্য হয়ে ওঠেন। তার নেতৃত্বগুণ এতটাই মুগ্ধ করেছিল ক্লাব কর্তৃপক্ষকে যে মাত্র ২২ বছর বয়সেই এসি মিলানের অধিনায়কের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় তার হাতে। এরপর দীর্ঘদিন সেই দায়িত্ব পালন করে তিনি ক্লাব ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তবে তার পথ সব সময় মসৃণ ছিল না। টোটোনেরো কেলেঙ্কারির কারণে এসি মিলানের অবনমন, আবার শীর্ষ লিগে ফিরে আসা, ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকা একটির পর একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। কিন্তু প্রতিবারই আরও দৃঢ়ভাবে ফিরে এসেছেন।
১৯৮৬ সালে সিলভিও বেরলুসকোনি ক্লাবের দায়িত্ব নেওয়ার পর এবং এক বছর পরে আরিগো সাক্কি কোচ হিসেবে যোগ দেওয়ার পর শুরু হয় এসি মিলানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সময়। রুড গুলিত, মার্কো ফন বাস্তেন ও ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডদের নিয়ে গড়া সেই দুর্দান্ত দলের রক্ষণভাগের প্রাণ ছিলেন বারেসি। তার নেতৃত্বে ১৯৮৮ সালে সিরি আ এবং ১৯৮৯ ও ১৯৯০ সালে টানা দুটি ইউরোপিয়ান কাপ জেতে মিলান।
পরে ফাবিও ক্যাপেলো দায়িত্ব নেওয়ার পরও বারেসি নিজের গুরুত্ব অটুট রাখেন। অনেকেই মনে করেছিলেন তার সময় শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু তিনি সমালোচনার জবাব দেন মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে। ক্যাপেলোর অধীনে আরও চারটি লিগ শিরোপা জয়ের পাশাপাশি ১৯৯৪ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফিও জেতে এসি মিলান।
ইতালির জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে আছেন বারেসি। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে টাইব্রেকারে প্রথম শটটি মিস করেছিলেন তিনি। ইতালির পরাজয়ের পর মাঠে তার অশ্রুসিক্ত মুখ আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। সেই দৃশ্য ছিল একজন নেতার দায়িত্ববোধ, হতাশা এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক।
১৯৯৭ সালের জুনে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন বারেসি। তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এসি মিলান স্থায়ীভাবে অবসরে পাঠায় কিংবদন্তি ৬ নম্বর জার্সিটি। অবসরের পরও ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। সহ-সভাপতি, যুব উন্নয়ন কার্যক্রমসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০২ সালে স্বল্প সময়ের জন্য ইংল্যান্ডের ফুলহ্যামে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করলেও পরে আবার ফিরে আসেন প্রিয় মিলানেই।
ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী মাউরার সঙ্গে তার সংসারে দুই ছেলে এদোয়ার্দো ও জিয়ানআন্দ্রেয়া। জাতীয় দল থেকে অবসরের পর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোই হয়ে উঠেছিল তার জীবনের অন্যতম অগ্রাধিকার।