বিখ্যাত গানের দল বিটলসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পল ম্যাককার্টনি তাঁর প্রয়াত মাকে স্বপ্নে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে গানটি গেয়েছিলেন। যে স্বপ্নে মা তাঁকে বহুদর্শী উপদেশ দিয়েছিলেন।
তাঁর মায়ের নাম ছিল মেরি প্যাট্রসিয়া ম্যাককার্টনি।
আমার পরিবারের অনেকেই পলের মা মেরি প্যাট্রসিয়ার মতো ভূমিকা পালন করেছেন। আমাকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন। তাঁদের কথা অনেকবার বলেছি। এর বাইরেও অনেক মহিলা আছেন, যাদের অবদান আমার জীবনের অনিবার্য অংশ।
আমি তাঁদের বলি, ‘অ্যাঞ্জেল মেরি।‘
আজ তাঁদের কয়েকজনের কথা বলব।
১) ১৯৮০ সাল। ক্লাস এইটে পড়ি। আমাদের ছিল কো-এডুকেশন স্কুল। তবে শিফট ছিল আলাদা। ছাত্রীদের সকালে। আমাদের বেলা এগারোটায়। তাই মেয়েদের সাথে আমাদের তেমন দেখা হতো না। বন্ধুত্বও হতো না। তারপরও অরুন্ধতি আমার খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেলো। শুধু একই স্কুলে পড়ি বলে নয়- আমরা প্রতিবেশী ছিলাম বলে।
একদিন সে আমাকে বলল, ‘বাদল, চলো, আমরা স্কুলে দেয়াল পত্রিকা বের করি।’
অরুন্ধতি ফিচেল হেসে বলল, ‘কেন? তুমি, আমি, তাছাড়া আরো কয়েকজনকে বলব।‘
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আমি লিখব? আমি কি লিখতে জানি নাকি?’
সে টেনে টেনে বলল, ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার। চেষ্টা করো, পারবে। এমনিতে তো মুখে মুখে কত আবোলতাবোল ছড়া বানাও।’
আমি বললাম হেডস্যারের পারমিশন নিতে কিন্তু আমি যাব না। নিল ডাউন করিয়ে রাখবে।‘
অরুন্ধতি বলল, ‘সেটা আমার দায়িত্ব।‘
আমি কঠিনভাবে বললাম, ‘আমি কিন্তু লেখা ছাড়া আর কোনো ফ্যাসাদে নেই।‘
মাসখানেক পর আমাদের স্কুলে চমৎকার একটি দেয়াল পত্রিকা বেরুল। যৌথভাবে সম্পাদক হিসেবে অরুন্ধতি এবং আমার নাম। অথচ আমি একটা ছড়া লেখা ছাড়া আর কোনো কাজ করিনি! সব কাজ করেছে সে। ওকে ব্যাপারটা বলতেই জবাব দিলো, ‘বুদ্ধিটা দুজনের না?’
আজ আপনি যে এই লেখাটি পড়ছেন, তা সম্ভব হয়েছে অরুন্ধতির কারণে। সে আমার মধ্য থেকে একজন লেখককে বের করে এনেছিল।
অরুন্ধতি এখন উচ্চপদস্থ ব্যাংকার। চমৎকার স্বামী আর প্রতিষ্ঠিত সন্তান নিয়ে তার ভরা সংসার।
২) ক্লাস টেনে পড়ি। তখন শফিকউল্লা স্যারের কাছে অঙ্ক পড়তে যেতাম। সেখানে অন্য স্কুলের একটি মেয়ের সঙ্গে দেখা হলো। আমরা দুজনেই আর্টসে পড়তাম। দুর্দান্ত ছাত্রী ছিল। কেন জানি, সে আমাকে পছন্দ করত না। সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবত। অন্যদের সাথে কথা বলত, আমার সাথে বলত না। ব্যাপারটা ইগোতে লাগায়, আমিও কথা বলতাম না।
এসএসসির টেস্ট পরীক্ষার পর সে হঠাৎ প্রথম কথা বলল, ‘ বাদল, একটা কথা বলতে চাইছি।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘বলো।‘
‘আমার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হবে না।‘
‘আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন চান না আমি পড়ি, তাই বাবা পরীক্ষা দিতে দেবেন না।‘
‘কী বলো? তোমার এত ভালো রেজাল্ট!’
সে কিছু না বলে চুপ করে রইল, তার নীরবতার ওজনে পুরো পৃথিবী যেন নতজানু হয়ে আছে।
আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এত ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে…!
নীরবতা ভেঙে সে বলল, ‘নাও, তোমার জন্য আমার নোটগুলো নিয়ে এসেছি। পরীক্ষাই দেবো না, এগুলো আর কী কাজে লাগবে? বরং তুমি কাজে লাগাও।‘
এরপর তার সাথে আমার আর দেখা হয়নি। হয়তো হবেও না।
৩) চট্টগ্রাম কলেজে পড়ি। ইংরেজির অজিত স্যারের বাসায় পড়তে যেতাম। সেখানে মহসিন কলেজের এক ছাত্রীও পড়ত।
তার হাত ধরেই সঙ্গীতের অলৌকিক জগতে আমার প্রবেশ। এর আগে গান শুনতাম, কিন্তু তেমন মনোযোগ দিয়ে নয়। সে আমাকে গানের বিভিন্ন ঘরানার সাথে পরিচয় করালো। ইংরেজি গানের কিংবদন্তিদের সম্পর্কে ধারণা দিলো। ভূপেন হাজারিকার ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন’ গানটি যে পল রবসনের OI’ man river গান দ্বারা অনুপ্রাণিত সেটা আমি তার কাছেই প্রথম শুনি।
এরপর আমি ভর্তি হলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে চলে গেলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু আমরা নিয়মিত চিঠি আদান-প্রদান করতাম। সে দোকানে অর্ডার করে ক্যাসেটে বিভিন্ন নির্বাচিত গান রেকর্ড করে আমার জন্য পাঠাত। আমি তাকে পাঠাতাম লিটল ম্যাগাজিন, বই, মাঝে মাঝে নিজের লেখা কবিতা।
১৯৯০ সালের দিকে বিয়ে করে সে আমেরিকা চলে গেলো। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বে ছেদ পড়ল না।
১৯৯২ সালে হঠাৎ করে সে আমার সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। কারণটি কী তা আমি জানি না। আমি অনেকগুলো চিঠি দিয়ে কোনো উত্তর পেলাম না।
২০১০ সাল। হঠাৎ একদিন ফেসবুকে ফ্রেন্ড সাজেশনে তাকে দেখালো। আমি অনেক দ্বিধা নিয়ে মেসেজ দিলাম, ‘চিনতে পেরেছ?’
কোনো কোনো ‘নো’ হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য। যার অর্থ হচ্ছে, ‘আর এগিও না।’
অর্থটি বোঝার বয়স তখন আমার হয়েছে। তাই চুপ করে রইলাম।
আজকের মতো শেষ হচ্ছে তিনজন অ্যাঞ্জেল মেরির গল্প। যারা আমাকে তিন ভুবনের তিনটি পথ দেখিয়েছিল।
হয়তো আরেকদিন অন্য কোনো অ্যাঞ্জেল মেরির গল্প নিয়ে ফিরব। আপনি কি সে গল্প পড়তে চান?
পাদটীকা: অরুন্ধতি ছাড়া অন্যদের সাথে যোগাযোগ না থাকায় নাম দিলাম না।
এ জাতীয় আরো খবর...