বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় রাতের অন্ধকারে অজান্তে অনুপ্রবেশকারী যেকোনো শত্রুনৌযানকে বহু ওপর থেকে নিঃশব্দে শনাক্ত করে হটিয়ে দেওয়া একসময় কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও তা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। চালকহীন বিমান বা ড্রোনের উত্থান আধুনিক সামরিক বিজ্ঞানের যুদ্ধকৌশলকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আকাশভেদী ফাইটার জেট বা সাজোয়া বহরের মতো শত শত কোটি ডলারের বিপুল ব্যয়বহুল অস্ত্রের দাপট কমিয়ে জায়গা করে নিয়েছে কম খরচের কিন্তু নিখুঁত প্রযুক্তির এই ইউএভি বা ড্রোন। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে তুরস্কের তৈরি বিখ্যাত ‘বাইরাক্তার টিভিটু’ ড্রোন, যা বর্তমানে শুধু একটি যুদ্ধাস্ত্র নয় বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত বাইকার কোম্পানিতে নির্মিত এই ড্রোনের পেছনের মূল প্রকৌশলী হলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী সেলচুক বায়রাক্তার, যিনি আধুনিক তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তির চিত্র একাই বদলে দিয়েছেন। তার আবিষ্কৃত এই সাশ্রয়ী অথচ কার্যকর ড্রোন ইউক্রেন, আজারবাইজান, সিরিয়া ও লিবিয়ার মতো একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রের গতিপথ এবং সামরিক ফলাফল রাতারাতি বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে কারাবাগ যুদ্ধে আর্মেনিয়ার আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধূলিসাৎ করে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে তুর্কি ড্রোন। তুরস্ক বুঝেছিল যে, ট্র্যাডিশনাল বা প্রথাগত যুদ্ধবিমানে আমেরিকা বা রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা না করে সস্তা ও উচ্চ ক্ষমতার ড্রোন বাজারে আনাই হবে বুদ্ধিমত্তার পরিচয়, যাকে সামরিক পরিভাষায় ‘ড্রোন ডিপ্লোমেসি’ বা ড্রোন কূটনীতি বলা হচ্ছে।
পূর্বে সামরিক সরঞ্জামের জন্য বাংলাদেশ মূলত চীন, রাশিয়া বা ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপরই বেশি নির্ভরশীল ছিল। তবে পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ঢাকার প্রতিরক্ষা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়েছে আঙ্কারা। ২০২২ সালের জুলাই মাসে তুরস্কের কাছ থেকে বাইরাক্তার ড্রোন কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ, যা পরবর্তীতে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নেয়। বঙ্গোপসাগরের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাজেটবান্ধব আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটাতে এই ড্রোন কেনা বেশ ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখছে। কেবল ড্রোন কেনাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বাংলাদেশে ড্রোন তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের জোর আলোচনা চলছে, যা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের সামরিক প্রভাব বহুগুণ বাড়বে।
তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের এই ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক রাজনীতি ও ভূরাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশকেও উসকে দিচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলে থাকেন, তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির রাজনৈতিক আদর্শের সাথে বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর সম্পর্কের বিষয়টি এখানে কাজ করছে কি না। তবে বাস্তবতার বিচারে এটি কেবল আদর্শিক সম্পর্কের চেয়ে অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হিসাব বলেই মনে হয়। কারণ পূর্ববর্তী শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই এই ঐতিহাসিক ড্রোন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেলচুক বায়রাক্তারের পরিবারের বাণিজ্যিক আগ্রহ এবং এরদোয়ানের বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক কৌশলই এই প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
তবে ড্রোন প্রযুক্তি গ্রহণ করার সাথে সাথে রক্ষণাবেক্ষণ, দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ এবং সমন্বিত সামরিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও সামনে চলে আসে। একই সাথে বঙ্গোপসাগর ঘিরে ভারত, চীন, মিয়ানমার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে চারমুখী কৌশলগত টানাফোড়ন রয়েছে, তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য বেশ জটিল একটি কাজ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থায়ী কোনো বন্ধু থাকে না, থাকে কেবল নিজস্ব স্বার্থ। তাই আকাশের নিরাপত্তা জোরদার করতে ড্রোন কেনা অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু সেই প্রযুক্তির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটা নিজেদের হাতে থাকবে—তার ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও কৌশলগত সার্বভৌমত্ব।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস