জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সন্দেহ আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ ব্যালটের রায়ে নির্ধারিত হবে—কে ধরবেন দেশের হাল, কে বাজাবেন বিজয়ের হুইসেল। এবারের নির্বাচনে ভোটাররা এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন; তাদের হাতে থাকছে দুটি ব্যালট—একটি দেশের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনের, অন্যটি রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে গণভোটের।
ভোটের সময়সূচি ও আয়োজন
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে। শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুতে ভোট স্থগিত থাকায় দেশের ২৯৯টি আসনে আজ ভোট হচ্ছে। নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি নিবন্ধিত দল অংশ নিচ্ছে। মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৭৯টি।
ভোটার পরিসংখ্যান ও তরুণদের ভূমিকা
এবার মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার। বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী তরুণ ভোটাররা, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণরাই এবারের নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারেন।
লড়াই মূলত দুই জোটের
টানা ২০ দিনের প্রচার শেষে আজ চূড়ান্ত ফয়সালা। ভোটের মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ এবং জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ‘ইনসাফ’ কায়েমের প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠ চষে বেড়িয়েছেন।
নিরাপত্তার চাদরে দেশ
ভোটকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রোন ও বডি ওর্ন ক্যামেরা। ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্র সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রয়েছেন ৪৫ হাজার দেশি ও ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের উত্তাপ
ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে গতকাল ইসিতে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে বিএনপি ও জামায়াত। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, সৈয়দপুর বিমানবন্দরে বিপুল পরিমাণ অর্থসহ আটকের ঘটনা এবং বিভিন্ন স্থানে টাকা বিতরণের বিষয়গুলো উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অভিযোগ করেন, তাদের জনসমর্থন প্রশ্নবিদ্ধ করতে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে এবং বডি ওর্ন ক্যামেরা বণ্টনে বৈষম্য করা হয়েছে।
হেভিওয়েটদের আসন
ঢাকার বেশ কয়েকটি আসনে লড়ছেন দলের শীর্ষ নেতারা। ঢাকা-১৭ আসনে লড়ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঢাকা-১৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। এছাড়া ঢাকা-১৩ আসনে লড়ছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
প্রত্যাশা ও শঙ্কা
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন নিয়ে মানুষের কৌতূহল ছিল তুঙ্গে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দীন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, “ভিন্নমত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। জয়-পরাজয় মেনে নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিন।”
দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ও জুলাইয়ের রক্তের দাগ না শুকাতেই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন গণতন্ত্রের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় হতে যাচ্ছে। এখন দেখার পালা, দিন শেষে জনগণের রায়ে কে হাসেন শেষ হাসি।