গুজব, নাটকীয়তা ও নানা শঙ্কার অবসান ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় এবং জামায়াতে ইসলামী জোটের শক্তিশালী অবস্থানের বিপরীতে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল জাতীয় পার্টির (জাপা) নজিরবিহীন ভরাডুবি। সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হওয়ার পর এই প্রথম দলটি একটি আসনেও জয়লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি তাদের দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুরেও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত দলটি।
২০০টি আসনে প্রার্থী দিয়েও শূন্য হাতে ফেরা জাপার এই বিপর্যয়ের পেছনে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ৫টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. মধ্যবর্তী অবস্থান ও স্বকীয়তা হারানো
একসময় রাজনীতিতে ‘কিংমেকার’ হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টি গত দেড় দশকে নিজেদের অবস্থান অস্পষ্ট করে ফেলেছিল। দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতার অংশীদার থেকেও বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের দাবি—এই দ্বৈত নীতি ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি এবং বিতর্কিত নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দিতে গিয়ে জাপা তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
২. নেতৃত্বের সংকট ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল
এরশাদের মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্ব নিয়ে স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ভাই জি এম কাদেরের বিরোধ দলকে ভেতর থেকে দুর্বল করেছে। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মসিউর রহমান রাঙ্গাসহ অভিজ্ঞ নেতাদের বহিষ্কার ও দলত্যাগ তৃণমূল কর্মীদের হতাশ করেছে। নির্বাচনের আগে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রভাব পড়েনি।
৩. আওয়ামী লীগের পতনের প্রভাব
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন জাপার জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে পরিচিত জাপা এবার সেই সমর্থন বা সুবিধা পায়নি। বরং অভ্যুত্থানের পর তাদের কার্যালয়ে হামলা এবং নিষিদ্ধের দাবির মুখে দলটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
৪. ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকের ধস
রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে লাঙ্গল প্রতীকের প্রতি মানুষের যে আবেগ ছিল, তা এবার ম্লান হয়েছে। জি এম কাদের রংপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে হেরে তৃতীয় হয়েছেন। তরুণ ভোটাররা জাপার পুরোনো রাজনীতিতে আকৃষ্ট হননি, বরং তারা পরিবর্তন ও উন্নয়নের নতুন প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখেছেন।
৫. সাংগঠনিক দুর্বলতা
নির্বাচনে জয়ের জন্য যে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো, বুথ কমিটি ও নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, জাপা তাতে ব্যর্থ হয়েছে। নিয়মিত রাজনৈতিক কার্যক্রম না থাকায় ভোটারদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। ভোটের দিন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিত করার মতো সাংগঠনিক শক্তি দলটির ছিল না।
অস্তিত্বের সংকট
১৯৯১ সালে ৩৫টি আসন পাওয়া জাপা ২০০৮ সালে ২৮টি, ২০১৮ সালে ২২টি এবং ২০২৪ সালে ১১টি আসনে নেমে আসে। আর ২০২৬-এর এই নির্বাচনে শূন্য আসনে পর্যবসিত হওয়াকে অনেকে জাপার রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে দেখছেন।