জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে, তা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নাম দেওয়া হলেও বিশ্লেষকরা একে দেখছেন বাংলাদেশের জন্য এক ‘অসম’ ও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ দলিল হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে, এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যাপক সুবিধা দেওয়া হলেও বিনিময়ে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমেছে মাত্র ১ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নামমাত্র এই শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে দেশের পোলট্রি, ডেইরি এবং তৈরি পোশাক খাতকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
পোলট্রি ও ডেইরি খাতে অশনির সংকেত
চুক্তির ১.৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পোলট্রি ও ডেইরি পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করলে কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ছাড়পত্র দিতে হবে। এতে দেশের জনস্বাস্থ্য এবং প্রাণিসম্পদ খাত বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সবচেয়ে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ১.৮ অনুচ্ছেদ। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো রাজ্যে বার্ড ফ্লু দেখা দিলেও বাংলাদেশ সে দেশ থেকে ঢালাওভাবে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে পারবে না। শুধুমাত্র আক্রান্ত এলাকার ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের বাইরের এলাকা থেকে পণ্য আনতে হবে। জনস্বাস্থ্যের জন্য একে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মার্কিন সরকার তাদের কৃষকদের বিপুল ভর্তুকি দেওয়ায় তাদের সস্তা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশের খামারিদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
পোশাক শিল্পে ‘কটন’ কূটনীতি
দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও এই চুক্তির কারণে চাপের মুখে পড়তে পারে। চুক্তির ৫.৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তখনই বাংলাদেশ থেকে শুল্কমুক্ত পোশাক নেবে, যখন বাংলাদেশ সেই পোশাক তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুতা ও তুলা ব্যবহার করবে।
এর ফলে পোশাকশিল্পে কাঁচামালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা তৈরি হবে এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা কমার আশঙ্কা রয়েছে।
বাণিজ্যিক স্বাধীনতা খর্বের শঙ্কা
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বাধীনতাও খর্ব করা হয়েছে। চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে, কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে পণ্য ক্রয় সীমিত করতে হবে। এটি মূলত চীন বা রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ইঙ্গিত করে, যা ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এই চুক্তিকে ‘অত্যন্ত বিকৃত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশের ওপর দায়বদ্ধতার তালিকা অনেক দীর্ঘ। এর চেয়ে প্রচলিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) অনুসরণ করা উচিত ছিল”।
সরকারের শেষ সময়ে এসে কেন এত তড়িঘড়ি করে এমন একটি স্পর্শকাতর চুক্তি করা হলো, তা নিয়ে জনমনে এখন প্রবল প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।