শিরোনামঃ
ছানি অপারেশন ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন ডা. জুবাইদা রহমান সড়কপথে যুক্ত হচ্ছে ভোলা, মহাসড়ক নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা নিবেদন পিংক বাস: প্রয়োজনীয়, কিন্তু সম্পূর্ণ সমাধান নয় জাতীয় সংসদের ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা মার্কিন আদালতে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিতের নীতি বাতিল গ্যাস সংকট: তবু অর্ডার কমেনি পোশাক কারখানায রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগ্রহ কম বিএনপির মন্ত্রিসভার আকার বেড়ে হলো বায়ান্ন, উপদেষ্টার সংখ্যা সর্বোচ্চ
শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক | বিশেষ প্রতিবেদন / ৬৭ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে কোনো দল যদি এককভাবে ২০০ বা তার বেশি আসনে জয়লাভ করে, তবে তাকে ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ বলা হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি বিশাল বিজয় মনে হলেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে—এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রায়শই সংবিধান পরিবর্তন এবং একদলীয় শাসন বা কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

সংবিধান পরিবর্তন করতে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের প্রয়োজন হয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখনই কোনো দল এই ‘ম্যাজিক ফিগার’ অর্জন করেছে, তখনই তারা দেশের সর্বোচ্চ আইন বা সংবিধানকে নিজেদের মতো করে বদলে ফেলেছে।

১৯৭৩: একদলীয় শাসনের সূচনা

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু এর মাত্র দুই বছরের মাথায়, ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। এরপর সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে ‘বাকশাল’ গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়।

১৯৭৯: সামরিক শাসনকে বৈধতা দান

১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। এই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্বের সকল সামরিক ফরমান ও কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া হয়। এছাড়া সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্ত করা হয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি থেকে সরে আসা হয়।

১৯৮৬ ও ৮৮: এরশাদের ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রধর্ম

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৬ ও ৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি নিরঙ্কুশ জয় পায়। এই সময়ে সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া হয় এবং ১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।

১৯৯৬ ও ২০০১: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বিচারপতির বয়স বিতর্ক

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮টি আসন পায়। তীব্র আন্দোলনের মুখে তারা সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ২০০১ সালে চারদলীয় জোট ২১৬টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। তারা সংবিধান সংশোধন করে প্রধান বিচারপতির অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান কে হবেন—তা নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।

২০০৮ পরবর্তী অধ্যায়: তত্ত্বাবধায়ক বাতিল ও টানা ক্ষমতা

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি (জোটসহ ২৬২) আসন পায়। এই বিশাল ম্যান্ডেট ব্যবহার করে তারা আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো বিতর্কিত আইন পাস করে। বিরোধীদের মতে, এই দীর্ঘ সময়ে সংসদ কার্যত বিরোধীদলহীন ও প্রাণহীন হয়ে পড়েছিল।

বিশ্লেষকদের মত

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, “দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেলে সংসদ আর প্রাণবন্ত থাকে না, বরং একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়।” ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, বিশাল এই ম্যান্ডেট বারবার শাসকদের কর্তৃত্বপরায়ণ বা ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে।

আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনে বা ভবিষ্যতের যেকোনো ভোটে যদি কোনো দল আবারও এমন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পায়, তবে তারা ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি ঘটাবে নাকি ভিন্ন কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।


এ জাতীয় আরো খবর...