নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের ৪০ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ইশতেহারে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি সাজিয়েছিল। সরকার গঠনের পর এখন সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নই দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিএনপির সামনে রয়েছে পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতা।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড: অর্থের উৎস কোথায়?
ইশতেহারে বিএনপি নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশাল ব্যয়ের অর্থ আসবে কোথা থেকে? অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনের মতে, যদি ৫০ লাখ পরিবারকেও ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় মাসে আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়া হয়, তবে বছরে প্রয়োজন হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। আর যদি দেশের ৪ কোটি পরিবারকে এর আওতায় আনা হয়, তবে ব্যয় দাঁড়াবে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের সংস্থান করাই হবে সরকারের জন্য প্রথম অগ্নিপরীক্ষা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বৃদ্ধি: বাস্তবতা কতটুকু?
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে, যা বর্তমানে ১-২ শতাংশের নিচে। বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোতে এই বরাদ্দ রাতারাতি বাড়ানো কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
দুর্নীতি ও সুশাসন: অতীতের ছায়া
রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও বিএনপির অতীত রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০০৪ সালে তাদের শাসনামলে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত হলেও বাংলাদেশ পরপর কয়েক বছর দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, শুধু আইন বা কমিশন গঠন করলেই হবে না; সুশাসন, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চালু করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
পররাষ্ট্রনীতি: ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষা
বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে প্রতিবেশী ভারতসহ চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ হবে না। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, “ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্বার্থগুলোকে অন্য কোনো দেশ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়”। আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের পর সংসদকে জানানোর কথা বলা হলেও, চুক্তির আগে সংসদে আলোচনার বিষয়ে ইশতেহারে কিছু বলা নেই, যা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
সার্বিক বিবেচনায়, বিএনপির ইশতেহারে প্রতিশ্রুতির কমতি নেই, কিন্তু তার বাস্তবায়নে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতা। সময়ই বলে দেবে, নতুন সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা সফল হয়।