শিরোনামঃ
ছানি অপারেশন ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন ডা. জুবাইদা রহমান সড়কপথে যুক্ত হচ্ছে ভোলা, মহাসড়ক নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা নিবেদন পিংক বাস: প্রয়োজনীয়, কিন্তু সম্পূর্ণ সমাধান নয় জাতীয় সংসদের ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা মার্কিন আদালতে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিতের নীতি বাতিল গ্যাস সংকট: তবু অর্ডার কমেনি পোশাক কারখানায রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগ্রহ কম বিএনপির মন্ত্রিসভার আকার বেড়ে হলো বায়ান্ন, উপদেষ্টার সংখ্যা সর্বোচ্চ
শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৩২ অপরাহ্ন

দুঃস্বপ্ন নাকি এক হারানো সুযোগ: যেভাবে ইউনূস সরকারকে মনে রাখবে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা / ৮১ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

একটি সুন্দর সকাল সবসময় সুন্দর দিনের বার্তা দেয় না—গত ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলকে এভাবেই মূল্যায়ন করছেন দেশের সিংহভাগ মানুষ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে বিপুল স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, আজ বিদায়বেলায় তা পরিণত হয়েছে চরম হতাশায়। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় জনমনে স্বস্তি—অবশেষে শেষ হচ্ছে এক ‘দমবন্ধ’ অধ্যায়।

ইতিহাস এই সরকারকে কীভাবে মনে রাখবে? গত দেড় বছরের চিত্র বলছে, এই সময়কাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে মূলত প্রত্যাশাভঙ্গ, মব জাস্টিস, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং ‘নিজের আখের গোছানোর’ অধ্যায় হিসেবে।

শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসকে জাতি অভিভাবক হিসেবে ভেবেছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে তিনি নিজের ও নিজের প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী ছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তার বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের মতো মামলাগুলো নজিরবিহীন দ্রুততায় প্রত্যাহার করা হয়।

সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো। এই সময়ে গ্রামীণ ব্যাংকের বিপুল বকেয়া কর মওকুফ এবং ভবিষ্যতের আয় করমুক্ত করা হয়েছে। সরকারি মালিকানা ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। কোনো টেন্ডার ছাড়াই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ৭০০ কোটি টাকা গ্রামীণ ট্রাস্টে হস্তান্তর এবং ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ ও ডিজিটাল ওয়ালেটের অনুমোদন—এসবই ঘটেছে চরম অস্বচ্ছতায়।

গত ১৮ মাসে দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে আটকে আছে, যা মধ্যবিত্তের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। পিপিআরসি’র গবেষণায় দেখা গেছে, দারিদ্র্যের হার বেড়ে প্রায় ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও উচ্চ সুদের হারের কারণে বিনিয়োগ স্থবির। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ব্যবসায়ীদের ওপর ঢালাও মামলা ও হয়রানি। ফলে বেসরকারি খাত এখন অস্তিত্ব সংকটে, যা আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে।

‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি সংস্কৃতি ছিল গত দেড় বছরের নিত্যসঙ্গী। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, সুফি-বাউলদের মাজার এবং নারীদের ওপর হামলার ঘটনা ছিল উদ্বেগজনক। খোদ প্রধান উপদেষ্টা নারীদের ওপর হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার প্রশ্ন তুলেছে।

শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের লাঞ্ছনা ও জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর সংস্কৃতি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে, উগ্রবাদের হুমকিতে কনসার্ট ও নাটক বাতিল এবং শিল্পীদের হেনস্তা করার ঘটনা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আতঙ্কিত করে রেখেছিল।

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল, সেটি এখন বেড়ে ২১ শতাংশের ওপর চলে গেছে। আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে এখন ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশে বেকারত্ব বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গিয়ে দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। এই সময়ে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সাল নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশটির মোট ঋণের ৩৩ শতাংশেরও বেশি।

ড. ইউনূস মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বললেও বাস্তবে তার শাসনামলে গণমাধ্যমকর্মীরা ছিলেন তটস্থ। দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোর অফিসে হামলা এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও হত্যা মামলা দায়েরের ঘটনা ছিল নিয়মিত চিত্র। ভিন্নমত দমনে সরকার ছিল নীরব, কখনো বা প্রশ্রয়দাতা।

উপদেষ্টাদের একান্ত ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তা নিয়ে লোক দেখানো তদন্ত ছাড়া কিছুই হয়নি। অভিযুক্তরা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্তর্র্বর্তী সরকার শেষ বেলায় এসে বোয়িং কেনাসহ বিভিন্ন অস্বচ্ছ ও দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করেছে বলে অভিযোগ আছে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহু দেশ এখন বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দিচ্ছে না। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক এখন তলানিতে। রাজনীতির বিষবাষ্প থেকে খেলাধুলা মুক্ত রাখতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১৮ মাসে ক্রীড়া ক্ষেত্রেও ছিল হতাশার চিত্র। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশের ক্রিকেটে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের মানুষের সামনে নতুন করে গড়ার যে সুযোগ এনে দিয়েছিল, গত ১৮ মাসে তা অনেকটাই হাতছাড়া হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দুর্নীতি, দলীয়করণ (নিজস্ব লোকদের নিয়োগ) এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ইতিহাসের পাতায় একটি ‘দুঃস্বপ্নের কাল’ হিসেবেই হয়তো ঠাঁই পাবে। এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠত না যদি দেশের জনগণ শান্তিতে বসবাস করতে পারত।


এ জাতীয় আরো খবর...