শিরোনামঃ
মক্কা চুক্তি মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়, অন্যদের উদ্বেগের অবকাশ নেই: পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেপ্টেম্বরে তফসিল, ডিসেম্বরে স্থানীয় নির্বাচনের প্রথম ধাপ : সিইসি ডিগ্রিধারীর ভিড়ে কর্মদক্ষতার হাহাকার ডলারের ঝুঁকি ও বিনিয়োগ মন্দায় অনীহা উদ্যোক্তাদের: দেশীয় উৎসের পর এবার বিদেশি ঋণেও স্থবিরতা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: বাংলাদেশের সুযোগ না ঝুঁকি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আর্থিক দায়: বাজেট ছাপিয়ে লাগামহীন ভর্তুকির চাপ ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেসে হরিলুট: কোরআন ছাপার নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতায় বাড়ছে অপরাধের বিস্তার: ক্যাম্পের নিচে গোপন সুড়ঙ্গ ও সশস্ত্র সাম্রাজ্য কাশির সঙ্গে রক্ত, কখন এটি বিপদের সংকেত? নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে নিহত দেড় শতাধিক
বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:১৯ অপরাহ্ন

বিদেশি ঋণের পাহাড়: তিন মাসের ব্যবধানে সোয়া এক বিলিয়ন ডলারের উল্লম্ফন ও অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭৪ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং বড় বড় কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই ঋণের পরিমাণ যখন হু হু করে বাড়তে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এর প্রভাব নিয়ে নানা মহলে আলোচনার জন্ম দেয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সূচক—বিদেশি ঋণের পরিসংখ্যানে ঠিক এমনই একটি বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বর প্রান্তিকেই দেশের ঘাড়ে বিদেশি ঋণের বোঝা বেড়েছে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ঘটা এই আকস্মিক বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক মহলে নতুন করে ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশ করা এই হালনাগাদ পরিসংখ্যানের দিকে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট প্রান্তিকে বা মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই নতুন ঋণ যুক্ত হওয়ার ফলে বর্তমানে দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতির এই বিশাল অঙ্কের হিসাবটি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য পেছনের কয়েকটি প্রান্তিকের দিকে তাকানো যেতে পারে। যেমন, এর ঠিক আগের প্রান্তিক অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শেষে দেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ বিলিয়ন ডলারের সামান্য বেশি। তারও আগে, জুন প্রান্তিকে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাঝে কিছুটা কমার পর ডিসেম্বর প্রান্তিকে এসে ঋণ গ্রহণের গ্রাফটি আবারও বেশ খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠেছে।

এখন সাধারণ পাঠকের মনে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি জাগতে পারে তা হলো, হঠাৎ করে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ এতটা বেড়ে যাওয়ার পেছনের মূল কারণ কী? বিষয়টির একটি পরিষ্কার এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এই ঋণ বৃদ্ধির পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ বা অনুঘটক কাজ করেছে। প্রথমত, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন বা আকু-এর পেমেন্ট। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আকু পেমেন্ট একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। কিন্তু আলোচ্য ডিসেম্বর প্রান্তিকে এই আকু পেমেন্ট পরিশোধ করা হয়নি। যেহেতু এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নির্দিষ্ট সময়ে দেশের বাইরে যায়নি বা পরিশোধিত হয়নি, তাই হিসাবের খাতায় সেটি দেশের দায় বা ঋণ হিসেবেই যুক্ত হয়ে আছে।

ঋণ বৃদ্ধির দ্বিতীয় বড় কারণটি হলো দেশের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলোর কার্যক্রম। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রমতে, এই নির্দিষ্ট প্রান্তিকে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলোর মাধ্যমে বিদেশ থেকে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ দেশের ভেতরে প্রবেশ করেছে। এই নতুন আসা ডলারগুলোও সাময়িকভাবে দেশের বিদেশি ঋণের খাতায় যুক্ত হয়েছে, যার ফলে সার্বিক ঋণের অঙ্কে এমন একটি বড় লাফ দেখা গেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা এটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, এই ঋণ বৃদ্ধির পেছনে কেবল সরকারি খাতই একা দায়ী নয়। বরং সরকারি এবং বেসরকারি—উভয় খাতেই সমানতালে বিদেশি ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে বলেই মোট ঋণের অঙ্ক এতটা স্ফীত হয়েছে।

এই ঋণের খাতভিত্তিক বিভাজনের দিকে তাকালে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের নির্ভরতার একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে মোট বিদেশি ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি রয়েছে সরকারি খাতের ঘাড়ে, যার পরিমাণ ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, দেশের বেসরকারি খাত বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও পিছিয়ে নেই; তাদের নেওয়া বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সরকার যেমন উন্নয়ন প্রকল্প বা অন্যান্য প্রয়োজনে বিদেশি ঋণ গ্রহণ বাড়িয়েছে, ঠিক তেমনি বেসরকারি খাতও তাদের ব্যবসায়িক প্রসার বা মূলধনের প্রয়োজনে বিদেশি উৎস থেকে আগের চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে।

অর্থনীতিতে এই বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণের প্রভাব আসলে কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সবসময়ই এক ধরনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ চলতে থাকে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকার এবং সহজভাবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, একটি দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে, বিশেষ করে বড় বড় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ বা উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে হলে বিদেশি ঋণের কোনো বিকল্প নেই। ঋণ নেওয়াটা কোনো অপরাধ বা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর কিছু নয়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়টি হলো, বিদেশ থেকে চড়া সুদে বা শর্তে আনা এই বিপুল পরিমাণ অর্থের সঠিক এবং উৎপাদনশীল ব্যবহার হচ্ছে কি না।

ড. জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদেশি ঋণের অর্থ যদি এমন কোনো মেগা প্রকল্প বা উন্নয়নমূলক কাজে বিনিয়োগ করা হয়, যা থেকে অদূর ভবিষ্যতে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং সরাসরি অর্থনৈতিক সুফল বা রাজস্ব আসবে, তবে সেই ঋণ দেশের জন্য আশীর্বাদ। কারণ ওই প্রকল্প নিজেই নিজের ঋণের টাকা শোধ করার মতো সক্ষমতা তৈরি করতে পারবে। কিন্তু এর উল্টো চিত্রটি দেশের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। যদি ঋণের টাকা অপচয় হয়, দুর্নীতিতে হারিয়ে যায়, কিংবা এমন কোনো প্রকল্পে ব্যয় হয় যা থেকে কোনো অর্থনৈতিক প্রতিদান আসবে না, তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই ঋণ গোটা অর্থনীতি এবং দেশের সাধারণ মানুষের জন্য একটি অসহনীয় বোঝায় পরিণত হবে।

একই সুর অনুরণিত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কণ্ঠেও। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, বিদেশি ঋণের সঠিক এবং সময়োপযোগী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা কেবল দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নই ঘটায় না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বা ক্রেডিট রেটিংও বৃদ্ধি করে। কিন্তু যদি এই বিপুল পরিমাণ বিদেশি ফান্ডের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সদ্ব্যবহার করা না যায়, তবে এই ঋণই একসময় দেশের রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে। তাই প্রতিটি বিদেশি ঋণের অর্থ ঠিক কোন খাতে, কীভাবে এবং কতটুকু স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় হচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে তদারকি করার জন্য সরকারকে অবশ্যই একটি কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দিন শেষে, ঋণের অঙ্ক কতটা বড় তার চেয়েও বেশি জরুরি হলো সেই ঋণের টাকায় দেশের অর্থনীতি কতটা লাভবান হচ্ছে।


এ জাতীয় আরো খবর...