ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, নৈতিকতার বিকাশ এবং দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় ম্যান্ডেট নিয়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনে সংঘটিত হয়েছে নজিরবিহীন আর্থিক জালিয়াতি ও হরিলুট। এমনকি মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে পবিত্রতম ধর্মগ্রন্থ কুরআনুল কারীম মুদ্রণ ও কেনাকাটার ক্ষেত্রেও নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। একটি অনুসন্ধানী টেলিভিশন চ্যানেলের বিশদ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব আধুনিক ছাপাখানা থাকা সত্ত্বেও সরকারি ক্রয় নীতিমালা ও বিধিমালার তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে বেসরকারি প্রেস থেকে নিম্নমানের কোরআন শরীফ ও পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ নেওয়া হয়েছে। কার্যাদেশ ছাড়া কাজ দেওয়া, অবাস্তব সাব-কন্ট্রাক্ট তৈরি করা এবং এমনকি কোনো কোরআন মুদ্রণ না করেই রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা তুলে নেওয়ার মতো দুঃসাহসিক জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে নথিপত্রে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে ১৯৯৩ সাল থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্প। সুবিধাবঞ্চিত, এতিম ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাঝে প্রাক-প্রাথমিক, সহজ কোরআন শিক্ষা এবং বয়স্কদের সাক্ষরতা দানের লক্ষ্যে এই প্রকল্পের অষ্টম ধাপ বর্তমানে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দে চলমান রয়েছে। সারা দেশের প্রায় ৭৩ হাজার ৭৬৮টি কেন্দ্রের মাধ্যমে পাঠদান পরিচালনা করছেন প্রায় ৭৬ হাজার ৭০ জন শিক্ষক ও কর্মী, যাদের মাসিক সম্মানী মাত্র ছয় হাজার টাকা। স্বল্প আয়ের এই শিক্ষকরা যখন আন্তরিকতার সাথে সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়াতে নিজেদের উৎসর্গ করছেন, তখন এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কোরআনুল কারীম ও অন্যান্য ধর্মীয় পাঠ্যবই ছাপানোর নামেই তৈরি হয়েছে এক সর্বগ্রাসী লুটেরা সিন্ডিকেট।
সরকারি বিধি অনুযায়ী মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা প্রকল্পের জন্য কোরআন শরীফ ও যাবতীয় পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের কাজটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিজস্ব প্রেসে সরাসরি সম্পাদন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের বেসরকারি প্রেসকে যুক্ত করার বা সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। কিন্তু প্রাপ্ত গোপন নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বাইরের বিভিন্ন প্রেস থেকে প্রায় ২৩ লাখ ৩১ হাজার কপি কোরআন শরীফ ক্রয় করা হয়েছে। ‘দশদিশা প্রিন্টার্স’ নামের একটি প্রেস থেকেই কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দুই লাখেরও বেশি কোরআন মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজ করানো হয়। এছাড়া সাবেক এক সংসদ সদস্যের পরিবারের মালিকানাধীন ‘ধলেশ্বরী লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ ছাড়াই কাজ দেওয়ার নজির মিলেছে, যেখানে একটি কোরআনও না ছাপিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। অত্যন্ত নিম্নমানের কাগজে ছাপানো এসব কোরআন নামমাত্র মূল্যে কিনে পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা লোপাট করেছে একটি বিশেষ চক্র।
অনিয়মের এই জাল কেবল পবিত্র কোরআনেই সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রকল্পের কায়দা, আমপারা ও অন্যান্য ধর্মীয় সহায়ক পুস্তকের মুদ্রণেও চালানো হয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি। ২০১৫ থেকে ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে রাজধানীর নয়াপল্টনের ‘প্রিয়াঙ্কা প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন’, যাত্রাবাড়ীর ‘বর্ণসভা মুদ্রায়ণ’, ‘পেপার প্রসেসিং’, ‘এসআর প্রিন্টার্স’ এবং ‘ফরাজি প্রিন্টার্স’ সহ পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে প্রায় দেড় কোটি বই ছাপানো হয়। সরকারি নীতিমালায় সাব-কন্ট্রাক্টের কোনো সুযোগ না থাকলেও ‘ফ্লাইং মুদ্রণ’ বা অলিখিত সমঝোতার মাধ্যমে কোনো আনুষ্ঠানিক কার্যাদেশ ছাড়াই এসব কাজ বণ্টন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট প্রেস মালিকদের অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে ও মালিকানা পরিবর্তন করে দেশ ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। বাজারমূল্যের চেয়ে অর্ধেক দামে এসব নিম্নমানের বই প্রস্তুত করে রাষ্ট্রের প্রায় ২১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এমনকি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ধর্মীয় পাঠ্যবই সরবরাহের ক্ষেত্রেও নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ছাপাখানার অভ্যন্তরীণ কেনাকাটা এবং যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির আরেক চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। প্রেসের জন্য অত্যাধুনিক স্ক্যানার, প্রিন্টার ও ওএমআর মেশিন ক্রয়ের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কৌশলে বাদ দিয়ে ‘গ্লোবাল কালার স্ক্যান’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে উচ্চমূল্যে কাজ দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, সর্বনিম্ন দরদাতা ‘এমএন মল্লিক অ্যান্ড কোম্পানি’ এবং কাজ পাওয়া ‘গ্লোবাল কালার স্ক্যান’ মূলত আপন দুই ভাইয়ের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। প্রেসের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে তারা পারিবারিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়া প্রেস ব্যবস্থাপকসহ বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির তদন্ত চলমান রয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, কেবল ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুদ্রণ, বাঁধাই ও অতিরিক্ত মূল্যে মালামাল ক্রয় বাবদ সরাসরি ৩৬৪ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জমে থাকা সরকারি অডিট আপত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের কাঠামোগত অসহযোগিতা এবং সাবেক প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সেই তদন্তগুলো কোনো আলোর মুখ দেখেনি।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সদ্য বিদায়ী শীর্ষ প্রশাসন এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, চোরও যেখানে কোরআন শরীফ চুরি করে না, সেখানে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নিয়ে এমন আর্থিক অনিয়ম অত্যন্ত লজ্জাজনক, চরম নিন্দনীয় এবং গভীর উদ্বেগের বিষয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দীর্ঘদিনের এই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগের জায়গায় আঘাত হেনে এবং কোমলমতি শিশুদের শিক্ষার অধিকারকে পদদলিত করে বছরের পর বছর ধরে চলা এই কোটি কোটি টাকার হরিলুটের সুষ্ঠু বিচার ও কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান দাবি।