বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৩৩ পূর্বাহ্ন

নেপালের প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার কারণ কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৪ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

২০১৫ সালের প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর নেপালে আঘাত হেনেছে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্প আঘাত হানার মাত্র তিন মিনিটের মাথায় নেপালে শুরু হয় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস। ভয়াবহ এই দুর্যোগে দেশটিতে অন্তত ১৫৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ৪০৩ জন মানুষ, যাদের অধিকাংশই বিদেশি পর্যটক। বুধবার (২৬ আগস্ট) দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় আকস্মিক এ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল গতকাল দেশটির পার্লামেন্টে বলেন, ভূমিকম্পটি হয় স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে। এর ৩ মিনিটের মাথায় অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘তবে এটা আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে।’

নেপাল পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকাগুলো থেকে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রসুয়ায় ১ জন, নুয়াকোটে ১১ জন, ধাদিংয়ে ১৮ জন, চিতওয়ানে ৩৩ জন, গোর্খায় ১৯ জন, তানাহুঁতে ৭ জন এবং নওয়ালপুরে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।

নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্যমতে, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক এবং ৬১ জন নেপালি। নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ২৬টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। নিখোঁজ এই ব্যক্তিদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ। ট্যুর অপারেটরদের বরাত দিয়ে পর্যটন বোর্ড আরও জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ভারত ও নেপালের সীমান্তবর্তী মানস সরোবরের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন।

কী ঘটেছে?

অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকার সড়ক, সেতু, বাড়িঘর ও বিদ্যুৎ প্রকল্প পানিতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে নেপাল সীমান্তের তিব্বত বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ভূমিধসের ফলে ওই এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

এই বিপর্যয়ের কারণ কী?

ধারণা করা হচ্ছে, ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্প হয়েছিল, যার ফলে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে নেপালের লেন্দে খোলা নদীতে ধসে যায়। এর ফলেই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। নদীটি নেপাল ও তিব্বত দুই দেশের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে।

বিপদ কি কেটেছে?

কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, লেন্দে খোলা নদীর উজানে এখনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে রয়েছে। এর ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়া নেপালের সীমান্তবর্তী ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশেও বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কারণ, হিমালয় থেকে নেমে আসা বেশ কয়েকটি নদী এই দুই রাজ্যের সমতল অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি 

পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পানি না কমা পর্যন্ত উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারবে না। নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

নিখোঁজ ৪৮৪ জন

দুর্যোগ আঘাত হানার কয়েক ঘণ্টা পরেও ১০৫ জন ভারতীয়, ৯৩ জন নেপালি, তিনজন মার্কিন নাগরিক এবং ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিকসহ অন্তত ৪৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরত ৮জন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।

অন্যান্য নিখোঁজদের মধ্যে ছিলেন ১৭ জন মালয়েশীয় নাগরিক, চারজন দক্ষিণ আফ্রিকান এবং অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।

উদ্ধার অভিযান কতটা এগিয়েছে?

চীন স্থলবন্দর এলাকায় অন্তত ৫৭৪ জন উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। তবে বন্যার সঙ্গে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পলি ও কাদামাটি উদ্ধারকাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য দেশগুলোও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রতিবেশী ভারত জানিয়েছে, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে তারা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে। দক্ষিণ কোরিয়াও সরকারি কর্মকর্তা, দমকলকর্মী ও পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি দ্রুত-প্রতিক্রিয়া দল পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।


এ জাতীয় আরো খবর...