শিরোনামঃ
বিধানসভা নির্বাচন: পশ্চিমবঙ্গবাসীর প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদির বিশেষ বার্তা দুই দশক পর গাজার দেইর আল-বালাহ শহরে পৌর নির্বাচন হরমুজ প্রণালীতে টোল আদায়: ইরানের কোষাগারে জমা হলো প্রথম আয় গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১২৯৫ শান্ত-লিটনের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিউজিল্যান্ডকে ২৬৬ রানের টার্গেট দিলো বাংলাদেশ শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কিলোমিটারে বাস ভাড়া বাড়ল ১১ পয়সা এক রিফাইনারিতেই খুঁড়িয়ে চলছে পাঁচ দশক: জ্বালানি নিরাপত্তায় সেনাপ্রধানের উদ্বেগ যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে যাচ্ছে বাংলাদেশের জরুরি ওষুধ অযোগ্য উপদেষ্টার খামখেয়ালির বলি শিশুরা!
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪১ অপরাহ্ন

ঋণের পাহাড় ও শূন্য থলের আখ্যান: কোন পথে বাংলাদেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

প্রবাদ আছে, অঢেল ধনেও অঢেল মন থাকে না, আর শূন্য থলেতে তো ধুলো বাজে না! বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির হালচাল যেন ঠিক এই শূন্য থলেটির মতোই। বাইরে থেকে রাষ্ট্রের জৌলুস যতই রঙিন আর জাঁকজমকপূর্ণ লাগুক না কেন, ভেতরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে চরম টানাপোড়েন আর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। রাষ্ট্র নামক এই বিশাল যন্ত্রটি আজ এমন এক অনিশ্চিত মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আয়ের খাতা মেলাতে গিয়ে স্বয়ং হিসাবরক্ষকরাও যেন হাঁপিয়ে উঠেছেন। কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা— কেবল এই একটি বাক্যের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে বর্তমান অর্থনীতির পুরো ক্ষতবিক্ষত চিত্র। রাষ্ট্রের আয় আশঙ্কাজনক হারে কমে গেলেও খরচের বহর এক চুলও কমেনি; বরং তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আয়ের সাথে ব্যয়ের এই বিশাল ফারাক মেটাতে গিয়ে ঘাটতির অঙ্ক বর্ষাকালের নদীর মতোই ফুলে-ফেঁপে উঠছে, যা আগামী দিনগুলোতে সরকারের জন্য এক অশনিসংকেত।

রাজস্ব সংগ্রহের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাস্তবতার চিত্র কতটা নির্মম। দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক নজিরবিহীন ঘাটতির মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই (জুলাই-মার্চ) রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। অথচ লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা আদায় করা প্রয়োজন ছিল, যা কোনো মাসেই চল্লিশ হাজার কোটির গণ্ডি সেভাবে পার হতে পারেনি। আয়কর, ভ্যাট এবং আমদানি শুল্ক— অর্থনীতির এই তিনটি প্রধান পিলারের কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে আয়কর খাতে। এর পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে দেশের করব্যবস্থার এক নগ্ন দুর্বলতা সামনে চলে আসে। বর্তমানে দেশে প্রায় এক কোটি আট লাখ টিআইএন ধারী রয়েছেন, অথচ এর মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়েছেন অর্ধেকেরও কম মানুষ। অর্থাৎ, করদাতাদের একটি বিশাল অংশ এখনও করজালের বাইরে রয়ে গেছেন। পাশাপাশি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি এবং আমদানিতে সংকোচন নীতি ভ্যাট ও শুল্ক আদায়কেও ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। কর-জিডিপি অনুপাত এখনও ৭ থেকে ৮ শতাংশের ঘরেই আটকে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন।

আয় না থাকলেও রাষ্ট্রের খরচ তো আর থেমে থাকে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশাল বেতন-ভাতা, মেগা অবকাঠামো উন্নয়নের খরচ, প্রশাসনিক ব্যয়— এসব তো চালিয়ে নিতেই হবে। আর এই বিপুল ব্যয় মেটাতে গিয়ে সরকার বাধ্য হয়ে হাত পাতছে ব্যাংকগুলোর কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ এক লাখ নয় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। শুধু জানুয়ারি থেকে মার্চ— এই তিন মাসেই নেওয়া হয়েছে বিপুল অঙ্কের ঋণ। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, সরকারের এভাবে একচেটিয়া ব্যাংক ঋণ নেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রবাহ তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। বেসরকারি খাত ঋণ না পেলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না, শিল্পকারখানা প্রসারিত হবে না এবং কর্মসংস্থান থমকে যাবে। এর ফলে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরও নিচে নেমে আসবে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই বছর প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচেই আটকে থাকতে পারে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র নিজেই ঋণ নিয়ে অন্যদের বেঁচে থাকার অক্সিজেনটুকু কেড়ে নিচ্ছে।

শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থাই নয়, বিদেশি ঋণের অবস্থাও রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৭৮ বিলিয়ন ডলার (প্রায় নয় লাখ কোটি টাকার উপরে) ছাড়িয়ে গেছে। বিগত বছরগুলোতে বড় বড় প্রকল্পের নামে যে বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে, তার সুফল সেভাবে অর্থনীতিতে যুক্ত না হলেও, এখন সেই ঋণের কিস্তি শোধ করার সময় ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে। আগামী পাঁচ বছরে (২০২৬-২০৩০) শুধু বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধেই বাংলাদেশকে গুনতে হবে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজ কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার কথা থাকলেও, সংস্থাটির দেওয়া কঠিন শর্ত পূরণে বারবার হোঁচট খাচ্ছে দেশ। রিজার্ভ এবং রাজস্ব আদায়ের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় পরবর্তী কিস্তির অর্থ ছাড় নিয়েও তৈরি হচ্ছে ঘোর অনিশ্চয়তা, যা বাজেট বাস্তবায়নে বিশাল ঝুঁকি তৈরি করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশ একটি ভয়ংকর ঋণের ফাঁদে আটকা পড়তে পারে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং অভ্যন্তরীণ ডলার সংকটের কারণে অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে মূল্যস্ফীতি। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করার পুরোনো নীতি আর ধরে রাখতে পারছে না সরকার। বাধ্য হয়েই দেশের বাজারে দফায় দফায় জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর এই চাপ একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তা সরাসরি প্রভাব ফেলছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। মূল্যস্ফীতির হার দীর্ঘদিন ধরেই ৮ থেকে ৯ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে, যা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে। অর্থনীতি এখন এমন এক দুষ্টচক্রে আটকে গেছে— মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সুদের হার বাড়ালে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে, আবার কর্মসংস্থান বাড়াতে বাজারে অর্থের জোগান বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও লাফিয়ে বাড়ছে। সরকার যেন একসাথে দুই দিক সামলাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

অর্থনৈতিক এই টানাপোড়েনের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে দারিদ্র্যের হার এখন ২১.২ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। কোভিডের সময় থেকে শুরু হওয়া মূল্যস্ফীতির এই গল্প এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও মানুষের বাস্তব আয় সেভাবে বাড়েনি, উল্টো কমেছে। বাধ্য হয়ে মানুষ কাটছাঁট করছে দৈনন্দিন খরচে, ভেঙে খাচ্ছে সঞ্চয়। এতে বাজারে পণ্যের চাহিদা কমছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে। অন্যদিকে, দেশের মোট আয়ের একটি বিশাল অংশ এখন মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। জিনি সহগ প্রায় ০.৫০ ছুঁইছুঁই, যা সমাজে চরম বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। সব মিলিয়ে মধ্যবিত্তের পরিসর ছোট হয়ে আসছে, যা একটি সুস্থ অর্থনীতির জন্য চূড়ান্ত অশনিসংকেত।

একদিকে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। যারা কাজ পাচ্ছেন, তাদের অনেকেই কম মজুরির ও নিম্ন উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। শিল্প খাত কিছুটা বাড়লেও সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়ছে না, যাকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আস্থাহীনতা, জ্বালানি সংকট ও নীতিগত অনিশ্চয়তা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের চরম নাজুক অবস্থা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন রেকর্ড ছাড়িয়ে প্রায় ২৪ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম এবং দুর্বল তদারকির কারণে ব্যাংক খাত আজ অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পরিণত হয়েছে। কঠোর ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই খাতকে কোনোভাবেই সুস্থ করা সম্ভব নয়।

সবশেষে এটি নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক চরম ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। সামনে পথ আছে ঠিকই, কিন্তু সেই পথে বিছানো রয়েছে অজস্র কাঁটা। এখন শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির সোনার হরিণের পেছনে অন্ধের মতো ছুটলে চলবে না, সবার আগে প্রয়োজন সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। কারণ, ভিত দুর্বল হলে ইমারত যত উঁচু আর চাকচিক্যময়ই হোক না কেন, তা যেকোনো মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। অর্থনীতিকে এই খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে হলে প্রয়োজন সুসংগঠিত নীতি, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের আমূল কাঠামোগত সংস্কার, অর্থপাচার রোধ, এবং সবচেয়ে বড় কথা— দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা পুনরুদ্ধার। সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে সামনের দিনগুলোতে এই নিদারুণ অর্থকষ্ট রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


এ জাতীয় আরো খবর...