পৃথিবীর বুকে মানুষের পদচারণা শুরু হয়েছিল অন্তত ৭০ লাখ বছর আগে। এরপর বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ বছর ধরে রাজত্ব করছে আধুনিক মানুষের প্রজাতি ‘হোমো সেপিয়েন্স’। আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে আজ মানুষ মহাকাশের ব্ল্যাক হোল পর্যন্ত উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানের জয়যাত্রা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে মানুষ নিজেই নিজের বংশগতির ধারক বা জিন পরিবর্তন করে এক ‘উন্নত’ প্রজন্ম তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ইলন মাস্ক মনে করেন, আধুনিক বিশ্বের জনসংখ্যা হ্রাস সভ্যতার জন্য বড় হুমকি। তবে তিনি কেবল সংখ্যায় নয়, বরং গুণে ও মানে ‘উন্নত’ মানুষের পক্ষপাতী। সমালোচকেরা তাঁকে ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ’ বা চরম জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সমর্থক বললেও, তিনি নীরোগ ও অতি বুদ্ধিমান সন্তান জন্মদানে প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করার পক্ষে। ইতিমধ্যে তিনি নিজেই ১৪ সন্তানের জনক হয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। ধারণা করা হয়, তাঁর সন্তানদের বুদ্ধিমত্তা ও শারীরিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে অত্যাধুনিক জিন প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
শুধু মাস্ক নন, বিশ্বের বহু ধনাঢ্য ব্যক্তি এখন নীরোগ, সুদর্শন এবং অতি মেধাবী সন্তানের স্বপ্ন দেখছেন। এই চাহিদা মেটাতে সান ফ্রান্সিসকোতে গড়ে উঠেছে ‘অর্কিড হেলথ’-এর মতো উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান। এই স্টার্টআপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ৩২ বছর বয়সী নূর সিদ্দিকী ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং জিনোম সিকুয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে মানুষের ভ্রূণের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে প্রায় নির্ভুলভাবে রোগ শনাক্ত করতে সক্ষম।
নূর সিদ্দিকী বলেন, “বাবা-মায়েরা তাঁদের সন্তানের ব্যাপারে কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। প্রযুক্তি তাঁদের সেই সুযোগই এনে দিয়েছে।” অর্কিডের দাবি অনুযায়ী, তারা ভ্রূণের ডিএনএর ৩০০ কোটি জোড়া বেস বিশ্লেষণ করে প্রায় ১ হাজার ২০০টি জিনের ত্রুটি শনাক্ত করতে পারে। এর ফলে ক্যানসার, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, বাইপোলার ডিসঅর্ডার কিংবা স্থূলতার মতো বংশগত রোগগুলো শিশুর জন্মের আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ কিন্তু সবার জন্য নয়। ‘নিখুঁত’ সন্তান পাওয়ার এই প্রক্রিয়াটি বেশ ব্যয়বহুল:
ভ্রূণের ত্রুটি পরীক্ষা: ২ হাজার ৫০০ ডলার।
ত্রুটিমুক্ত ভ্রূণ বাছাই: ২০ হাজার ডলার।
ব্যয়বহুল এই প্রযুক্তির সুবিধা কেবল ধনীরাই নিতে পারছেন। ইলন মাস্কের চার ‘সুপার’ সন্তানের জননী শিভন জিলিস এই অর্কিড হেলথের সেবা নিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।
বিজ্ঞানীদের এই সাফল্য যেমন রোগমুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়, তেমনি তৈরি করছে কিছু মৌলিক প্রশ্ন। সমালোচকদের মতে, প্রযুক্তি যদি কেবল ধনী শ্রেণিকে ‘সুপার হিউম্যান’ বা অতিমানুষে রূপান্তরিত করে, তবে সাধারণ মানুষের সাথে তাদের এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হবে। এতে মানবতা ‘উন্নত’ এবং ‘অনুন্নত’—এই দুই মেরুতে ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রযুক্তি কি তবে স্রষ্টার স্বাভাবিক সৃষ্টির নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মানুষের মধ্যেই এক কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করবে? নাকি কেবল রোগমুক্ত সুস্থ প্রজন্মের স্বার্থেই একে গ্রহণ করা হবে? ইলন মাস্ক বা নূর সিদ্দিকীদের এই নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন এখন নৈতিকতা ও বিজ্ঞানের এক বড় সংঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে।