মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৬ অপরাহ্ন

আকাশে মেঘ জমলেই শঙ্কা: মৃত্যুর নতুন নাম ‘বজ্রপাত’

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৪ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

এক সময় বৈশাখী ঝড়ের সাথে বিজলি চমকানো ছিল প্রকৃতির এক চিরায়ত রূপ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় সেই দৃশ্য আজ আতঙ্কের অন্য নাম। বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন আর কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক ভয়ংকর ‘জাতীয় ঘাতক’-এ। আকাশে কালো মেঘ জমলেই শ্রমজীবী মানুষের মনে এখন একটাই শঙ্কা কাজ করে— ‘বজ্রপাত হবে না তো?’ গত এক দশকে এই নীরব ঘাতকের আঘাতে ঝরে গেছে হাজার হাজার প্রাণ, যার মিছিল থামার কোনো লক্ষণ নেই।

মৃত্যুর ভয়ংকর পরিসংখ্যান: লাশের মিছিলে বাংলাদেশ

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ৪২৫ জনেরও বেশি মানুষ। তবে মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল উদ্বেগজনক।

বিশেষ করে ২০২৬ সালের চলতি মৌসুমেও সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। চৈত্র ও বৈশাখের তান্ডবে ইতিমধ্যে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত রবিবার ও সোমবার—এই মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ১৯ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল একদিনেই ১৩ জন মারা যাওয়ার রেকর্ড তৈরি হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশের আকাশে বজ্রপাত এখন কতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।

কেন ঘাতক হয়ে উঠল বজ্রপাত?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাত বাড়ার পেছনে মানুষের তৈরি পরিবেশগত বিপর্যয়ই প্রধানত দায়ী। বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন ও সালফারের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় কালো মেঘের ঘনঘটা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সামান্য বৃষ্টি বা ঝোড়ো বাতাসেই এখন তীব্র বজ্রপাত ঘটছে।

বিজ্ঞানীরা বজ্রপাত বাড়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:

  • নির্বিচারে গাছ কাটা: এক সময় গ্রাম ও হাওরাঞ্চলে প্রচুর উঁচু গাছ, বিশেষ করে তাল ও নারিকেল গাছ ছিল। এই গাছগুলো প্রাকৃতিকভাবে ‘বজ্রনিরোধক দণ্ড’ হিসেবে কাজ করত। এখন মাঠের পর মাঠ বৃক্ষশূন্য হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষই বজ্রপাতের প্রথম লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে।

  • উষ্ণায়ন: গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে বজ্রপাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের আশঙ্কা প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে যায়।

  • বায়ুদূষণ: বাতাসে ধূলিকণা ও রাসায়নিক গ্যাসের আধিক্য মেঘের মধ্যে ঘর্ষণ ও বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কৃষক ও প্রান্তিক মানুষ

ফিনল্যান্ডভিত্তিক বজ্রপাত বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘ভাইসালা’ এবং বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম’-এর তথ্য অনুযায়ী, বজ্রপাতে নিহতদের ৭০ শতাংশই কৃষক। মূলত হাওর ও চরাঞ্চলে যখন কৃষকরা ধান কাটা বা চাষাবাদের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন আশেপাশে কোনো উঁচু স্থাপনা না থাকায় তাদের শরীরই মাটির চেয়ে উঁচু বিন্দু হিসেবে কাজ করে। ফলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে তাদেরই। এছাড়া মাছ ধরার সময় ১৩ শতাংশ এবং গোসল বা বাড়ি ফেরার পথে ১৪ শতাংশ মানুষ বজ্রপাতের শিকার হন।

সরকারের ব্যর্থ উদ্যোগ ও বর্তমান পরিকল্পনা

২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণার পর থেকে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। অতীতে তালগাছ রোপণের যে বিশাল কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, তা অনিয়ম ও তদারকির অভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি জেলায় ৩৪৩টি ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অনেক জায়গায় যন্ত্র বসানো হলেও সেগুলো এখন অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার নতুন করে ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের মতো হাওরাঞ্চলগুলোতে কৃষকদের জন্য এক বিঘা জমির ওপর এই শেডগুলো তৈরি করা হবে। আকাশে কালো মেঘ দেখলেই কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন। এই শেডে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা থাকবে এবং এটি কৃষকদের ধান মাড়াই বা বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও কাজে লাগবে।

শহর এলাকার বিপদ: ঢাকা কি সুরক্ষিত?

অনেকেই মনে করেন শহর এলাকায় বজ্রপাতের ঝুঁকি কম, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রখ্যাত প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী এক সময় সতর্ক করেছিলেন যে, রাজধানীর ৯০ শতাংশ ভবনে কার্যকর বজ্রনিরোধক বা আর্থিং ব্যবস্থা নেই। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী প্রতিটি ভবনে এটি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও মালিকরা তা মানছেন না। ফলে বজ্রপাতের সময় ভবনের লিফট, ল্যানফোন বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাঁচার উপায়: সচেতনতাই একমাত্র পথ

জাপানের মতো উন্নত দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুহার বছরে ৩০ জন থেকে কমিয়ে ২ জনে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে কেবল সচেতনতার মাধ্যমে। বাংলাদেশেও এই দুর্যোগ থেকে বাঁচতে হলে কিছু মৌলিক নিয়ম মেনে চলা জরুরি:

১. মেঘ দেখলেই নিরাপদ আশ্রয়: আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে বা বিজলি চমকালে দেরি না করে পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিতে হবে।

২. গাছের নিচে দাঁড়ানো নিষেধ: বৃষ্টির সময় অনেকেই বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেন, যা সবচেয়ে বড় ভুল। উঁচু গাছে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

৩. ধাতব বস্তু ও ইলেকট্রনিক্স থেকে দূরে থাকা: বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ল্যান্ডফোন বা ধাতব কোনো বস্তু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৪. পানির সংস্পর্শ ত্যাগ: যারা পুকুর বা জলাশয়ে মাছ ধরেন বা গোসল করেন, তাদের দ্রুত পানি থেকে উঠে আসতে হবে।

৫. উবু হয়ে বসে পড়া: যদি আশেপাশে কোনো আশ্রয় না থাকে, তবে খোলা মাঠে দৌড়াদৌড়ি না করে দুই কানে হাত দিয়ে নিচু হয়ে উবু হয়ে বসে পড়তে হবে। মাটির সাথে শরীরের যোগাযোগ যতটা সম্ভব কম রাখতে হবে।

বজ্রপাতকে আমরা ঠেকাতে পারব না, কারণ এটি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার একটি অংশ। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে প্রাণহানি অবশ্যই কমানো সম্ভব। সরকারের উচিত কেবল কাগজ-কলমে প্রকল্প সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত হাওরাঞ্চলে শেল্টার সেন্টার স্থাপন করা এবং পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করা। সেই সাথে আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির ওপর মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত হস্তক্ষেপই আজ এই ‘বজ্র-ঘাতক’কে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। প্রকৃতিকে রক্ষা না করলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো হয়তো কোনো প্রযুক্তি দিয়েই সম্ভব হবে না।


এক নজরে বজ্রপাত থেকে বাঁচার ৬ টি মন্ত্র

  • কালো মেঘ দেখলেই ঘরের ভেতর বা পাকা দালানে চলে যান।

  • বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে বা বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে দাঁড়াবেন না।

  • ঘরের ভেতরে থাকলে জানালার গ্রিল বা ধাতব দরজা স্পর্শ করবেন না।

  • ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখুন এবং ল্যান্ডফোন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।

  • খোলা মাঠে আটকা পড়লে মাটিতে শুয়ে না পড়ে কানে হাত দিয়ে উবু হয়ে বসুন।

  • পুকুর বা জলাশয় থেকে দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে চলে যান।


এ জাতীয় আরো খবর...