মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৫ অপরাহ্ন

পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশের প্রবেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৬ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে আজ এক স্বর্ণালি অধ্যায় রচিত হলো। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরএনপিপি) প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৩টায় এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সূচনা হয়, যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্বে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। এই মাহেন্দ্রক্ষণে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা ‘রোসাটম’-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। এই জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করল। এটি কেবল একটি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন নয়, বরং দেশের কার্বনমুক্ত ও টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রকল্পের বিস্তারিত সূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। রাশিয়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ ১৮ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে বিশেষ চার্টার্ড বিমানে করে সরাসরি রাশিয়া থেকে ঢাকা পৌঁছান। ঢাকায় নেমে তিনি প্রথমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং প্রকল্পের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর তিনি হেলিকপ্টারে করে রূপপুর প্ল্যান্টে পৌঁছান। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধি এবং রুশ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিকেল সাড়ে ৩টায় ফুয়েল লোডিং শুরু হয়। এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা) প্রথম ইউনিটের কার্যক্রম শুরুর চূড়ান্ত লাইসেন্স এবং প্রকল্প পরিচালনার জন্য ৫২ জন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞের অনুমোদন দিয়েছিল। যদিও কিছু কারিগরি জটিলতার কারণে পূর্ব নির্ধারিত সময় থেকে কিছুটা পিছিয়ে আজকের এই তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত সফলভাবে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকল মহলে এক অভাবনীয় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় এবং জটিল প্রকৌশল সংবলিত মেগাপ্রকল্প, যা প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের দুটি ইউনিট থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ আজ সেই সব দেশগুলোর অভিজাত ক্লাবে যোগ দিল যারা টেকসই উন্নয়নের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই প্রকল্পটি বৈশ্বিক পারমাণবিক শিল্পের উন্নয়নে এবং রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। রোসাটমের সর্বাধুনিক ‘থ্রি প্লাস’ জেনারেশন প্রযুক্তিতে নির্মিত এই কেন্দ্রটি আগামী ৬০ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেবে এবং অত্যাধুনিক নকশার কারণে এর আয়ুষ্কাল পরবর্তীতে আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব হবে। এটি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে না, বরং এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও বিশাল ভূমিকা রাখবে।

জ্বালানি লোডিংয়ের পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অত্যন্ত আশাবাদী। চুল্লিতে ইউরেনিয়াম স্থাপনের পর পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ বা আগস্টের প্রথম সপ্তাহের দিকে কেন্দ্রটি থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরাসরি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। গ্রিড সংযোগের কারিগরি প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এরপর প্রতি মাসে ধাপে ধাপে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে উৎপাদন বাড়ানো হবে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিটের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। প্রথম ইউনিটের এই সফলতার পর চলতি বছরের শেষের দিকেই দ্বিতীয় ইউনিটের ফুয়েল লোডিং শুরু করার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে এই পুরো মেগাপ্রকল্পটি তার পূর্ণ ২,৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগে বাংলাদেশের এই প্রবেশ কেবল প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরিচয় নয়, বরং এটি দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে একটি বৈপ্লবিক ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান। রূপপুর প্রকল্পের দুটি ইউনিট যখন পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হবে, তখন এটি জাতীয় গ্রিডের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১২ শতাংশ একাই যোগান দেবে। পরিবেশগত দিক থেকেও এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ পারমাণবিক শক্তি জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কার্বন নিঃসরণহীন। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত অঙ্গীকার পূরণে বাংলাদেশ এক বিশাল ধাপ এগিয়ে গেল। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রথম ইউনিটের প্রথম কংক্রিট ঢালাইয়ের মাধ্যমে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, আজ জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে তার সফল বাস্তবায়ন শুরু হলো। আইএইএ-এর কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড, মাল্টি-লেয়ার প্রোটেকশন সিস্টেম এবং আন্তর্জাতিক পরিচালনা পদ্ধতি মেনে এই কেন্দ্রটি পরিচালিত হবে বলে নিশ্চিত করেছেন দেশি-বিদেশি পরমাণু বিজ্ঞানীরা। এই কেন্দ্রটি কেবল অন্ধকার দূর করবে না, বরং বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাকা আরও দ্রুততর করবে।

এই প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে শুরু থেকেই অত্যন্ত সচেতন ছিল সরকার ও রোসাটম। রাশিয়ার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে যেকোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কারিগরি ত্রুটিতেও কেন্দ্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ থাকতে সক্ষম। আইএইএ গত বছরের আগস্টে একটি বিশেষ নিরাপত্তা রিভিউ মিশন পরিচালনা করে রূপপুর প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর সন্তোষ প্রকাশ করেছিল। স্থানীয় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও রূপপুর একটি বড় ক্ষেত্র তৈরি করেছে; বর্তমানে হাজার হাজার দেশি প্রকৌশলী ও শ্রমিক রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতে নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরিতে সহায়ক হবে। ঈশ্বরদীর পদ্মা পাড়ের এই কর্মযজ্ঞ আজ সারা বিশ্বের নজরে রয়েছে, কারণ এটি কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার প্রযুক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী ক্ষেত্র। আজকের এই ইউরেনিয়াম লোডিং মূলত একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে যাত্রার শুরু, যা ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণতা পেয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে আলোকিত পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেবে।


এ জাতীয় আরো খবর...