মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪১ অপরাহ্ন

সংঘাত এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের পথে ১১ দল

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা / ৪ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশে জুলাই-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘গণভোটের রায়’ বাস্তবায়নের দাবিটি এখন রাজপথের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট তাদের আন্দোলনের কৌশল পুনর্নির্ধারণ করেছে। গতানুগতিক সংঘাতময় রাজনীতি পরিহার করে একটি সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত এবং ধাপে ধাপে জনমত গঠনের কৌশলে এগোচ্ছে এই রাজনৈতিক মোর্চা। জোটের নীতিনির্ধারকদের মতে, আন্দোলনের এই পর্যায়ে তারা এমন কোনো হঠকারী কর্মসূচিতে যাবে না যা জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বরং দীর্ঘমেয়াদী সক্ষমতা ধরে রেখে সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।

আন্দোলনের গতিপথ: সংঘাত নয়, ধারাবাহিকতা

১১ দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গতকাল স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাদের আন্দোলন কোনো সাময়িক বিক্ষোভ নয়। তিনি জানান, সরকার যদি তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে না নেয়, তবে এই আন্দোলন অনির্দিষ্টকাল অব্যাহত থাকবে। তবে এই লড়াইয়ে তারা সংঘাতের পথ এড়িয়ে চলতে চান।

জোটের শীর্ষ নেতাদের মতে, অতীতের রাজনৈতিক তিক্ততা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এখন ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ ও মিছিল-মিটিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা মনে করেন, জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো দাবিই দীর্ঘস্থায়ী রূপ পায় না। তাই জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়—এমন কর্মসূচি আপাতত তাদের তালিকায় নেই। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উসকানি না আসলে তারা আন্দোলনের এই গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

 ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার ৩টি স্তর

আন্দোলনকে চূড়ান্ত সফলতার দিকে নিয়ে যেতে ১১ দলীয় জোট একটি সুনির্দিষ্ট ‘থ্রি-স্টেজ’ বা তিন স্তরের পরিকল্পনা সাজিয়েছে:

  • তৃণমূল পর্যায়ে জনমত গঠন: আন্দোলনের প্রথম ধাপে বর্তমানে বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ছোট ছোট সমাবেশ, গণসংযোগ এবং লিফলেট বিতরণের কাজ চলছে। এর মাধ্যমে গণভোটের গুরুত্ব এবং সংবিধান সংস্কারের আবশ্যকতা জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

  • বিভাগীয় শক্তি প্রদর্শন: দ্বিতীয় ধাপে জোটের পরিকল্পনা রয়েছে দেশের বড় বড় বিভাগীয় শহরগুলোতে বিক্ষোভ সমাবেশ করার। এর মাধ্যমে জোট তাদের সাংগঠনিক শক্তির মহড়া দিতে চায় এবং স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সক্রিয় করতে চায়।

  • রাজধানীতে মহাসমাবেশ: আন্দোলনের তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপে রাজধানীতে একটি বিশাল জাতীয় মহাসমাবেশ ডাকার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই মহাসমাবেশ থেকেই সরকারকে আল্টিমেটাম দেওয়া হতে পারে এবং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী কঠোর কর্মসূচির রূপরেখা ঘোষণা করা হবে।

 ৩০ এপ্রিলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক: নীতিনির্ধারণী মোড়

আগামী ৩০ এপ্রিল ১১ দলীয় লিয়াজোঁ কমিটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে আন্দোলনের পরবর্তী স্তরগুলোর দিনক্ষণ এবং সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে। জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকে বিভাগীয় সমাবেশগুলোর চূড়ান্ত তারিখ এবং জাতীয় সমাবেশের জন্য ঢাকার কোনো একটি বড় ময়দান (যেমন পল্টন বা বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট) নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হবে। এছাড়া সরকার যদি দমন-পীড়ন চালায়, তবে বিকল্প হিসেবে কী ধরনের কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে জোটের শরিক দলগুলোর পরামর্শ নেওয়া হবে।

বর্তমান সংকট ও জাতীয় প্রেক্ষাপট

১১ দলের আন্দোলনের এই কৌশলী অবস্থানের পেছনে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে দেশব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট বিরাজ করছে। এই অস্থিরতার সময়ে কোনো কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচি জনজীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। ১১ দলের নেতারা মনে করেন, তারা যদি এখনই হরতাল বা অবরোধের মতো কর্মসূচি দেন, তবে তা জনগণের বিরক্তির কারণ হতে পারে।

জাগপা সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধানের মতে, “আমরা জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোনো কাজ করতে চাই না। দেশের ৭০ ভাগ মানুষ গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। তাদের সেই রায়ের মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে আমরা জনগণকে সাথেই রাখতে চাই, তাদের প্রতিপক্ষ করতে চাই না।”

 গণভোটের প্রাসঙ্গিকতা ও সাংবিধানিক বিতর্ক

১১ দলীয় জোটের মূল দাবি হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। তাদের অভিযোগ, বর্তমান সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সেই পথেই হাঁটছে যা শেখ হাসিনাকে ‘সাংবিধানিক স্বৈরাচার’ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। হামিদুর রহমান আযাদের মতে, সংবিধান কেবল সংশোধন করলেই হবে না, বরং আমূল সংস্কার করতে হবে এবং সেই সংস্কারের বৈধতার জন্য গণভোট অপরিহার্য। তারা মনে করেন, সরকার যদি জনমতকে উপেক্ষা করে তবে তারা জাতিকে অপমান করবে, যা রাজপথে বড় ধরনের গণবিস্ফোরণের জন্ম দিতে পারে।

 জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (IAB) জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ লেবার পার্টি (BLP) যোগ দেওয়ার ফলে ১১ দলের সংখ্যাতাত্ত্বিক শক্তি আগের মতোই রয়েছে। বর্তমানে জামায়াত, এনসিপি, খেলাফত মজলিস, জাগপা ও লেবার পার্টির মতো দলগুলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজপথে দীর্ঘ সময় ধরে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি ধরে রাখা। বিশেষ করে যদি সরকার আলোচনা বা দাবির বিষয়ে কোনো সাড়া না দেয়, তবে এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কতদিন বজায় রাখা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

১১ দলীয় জোটের এই ‘ধীরে চলো’ নীতি মূলত একটি রাজনৈতিক পরিপক্কতার পরিচয় দিচ্ছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি কেবল সরকারের জন্যই সুবিধা বয়ে আনবে। তাই শান্তিপূর্ণ কিন্তু দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমে তারা সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি করতে চায়। ৩০ এপ্রিলের বৈঠকের সিদ্ধান্তই বলে দেবে বাংলাদেশের রাজপথ আগামী মে মাসে কতটা উত্তপ্ত হতে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত জোটের বার্তা একটাই—সংঘাত নয়, জনমতই তাদের দাবির মূল হাতিয়ার।


এ জাতীয় আরো খবর...