বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে বঙ্গোপসাগরের ব্লক-১৮। বেইজিংভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘কেইএআই’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন ও কোরাল দ্বীপ অঞ্চলে প্রাথমিক সম্ভাব্য প্রায় ৬ হাজার ১৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) বা ৬ টিসিএফ গ্যাস সম্পদ রয়েছে। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, এই বিপুল মজুদ পাওয়া গেলে দেশের জ্বালানি খাতের চেহারা পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।
‘মন্টে কার্লো সিমুলেশন’ পদ্ধতিতে করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, কোরাল দ্বীপ এলাকায় গ্যাসের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। নিচে এলাকাভিত্তিক গ্যাসের প্রাথমিক উপস্থিতির (GIIP) চিত্র তুলে ধরা হলো:
গবেষণা অনুযায়ী, এখান থেকে অন্তত ২,০৬৪ বিসিএফ বা ২ টিসিএফের বেশি গ্যাস প্রমাণিতভাবে উত্তোলন করা সম্ভব।
বিগত দেড় দশক আগেই মার্কিন প্রতিষ্ঠান গুস্তাভসন অ্যাসোসিয়েটস এই অঞ্চলে বিপুল গ্যাসের ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি (LNG) ব্যবসার দিকে বেশি ঝোঁক থাকায় স্থানীয় অনুসন্ধানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
সিদ্ধান্তহীনতা: ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা জয়ের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ শুরু হয়নি।
বিদেশের অপেক্ষা: নিজস্ব সক্ষমতা না বাড়িয়ে বিদেশি কোম্পানির জন্য অপেক্ষায় সময় নষ্ট করা হয়েছে।
বিপরীত চিত্র: একই বেল্ট বা অঞ্চলে মিয়ানমার অনেক আগে থেকেই বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন,
“ফোল্ডবেল্ট অঞ্চলে সবসময় গ্যাস পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন ও ইনানী অঞ্চলে অনেকগুলো স্ট্রাকচার রয়েছে। মিয়ানমার এখান থেকে গ্যাস তুলছে, কিন্তু আমাদের অফশোর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান স্থবির হয়ে আছে। দ্রুত দরপত্রের মাধ্যমে কাজ শুরু করা জরুরি।”
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী জানান, এক টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গেলেও তা হবে দেশের জন্য বিশাল এক মজুদ। তবে ড্রিলিং বা অনুসন্ধান শুরু না করা পর্যন্ত চূড়ান্ত মজুদ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
পেট্রোবাংলা সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, সরকারের অনুমতি পেলে আগামী মাসেই (মে ২০২৬) আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে। গভীর সমুদ্রের ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রের ১১টি মিলিয়ে মোট ২৬টি ব্লকেই একযোগে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে ২০১০ সালে কনোকোফিলিপস, ২০১৬ সালে পস্কো দাইয়ু এবং পরবর্তী সময়ে এক্সনমবিলের মতো বড় কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখালেও দামের অমিল বা আইনি জটিলতার কারণে কাজ ছেড়ে চলে গেছে। আমদানিনির্ভর এলএনজি নীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ ছিল নামমাত্র। এখন দেখার বিষয়, ২০২৬ সালের এই নতুন দরপত্র আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে কতটা আকৃষ্ট করতে পারে।