মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪৪ অপরাহ্ন

আসছে বাজেটে পরোক্ষ করের চাপে পিষ্ট হতে পারে সাধারণ মানুষ

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক | ঢাকা / ৫ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে নীতি-নির্ধারক মহলে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার বিশাল এক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে। তবে এই বিশাল অংকের অর্থের একটি বড় অংশই আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস ডিউটির মতো পরোক্ষ করের মাধ্যমে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের ওপর এই অতিনির্ভরশীলতা দেশে আয়বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলবে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা আরও ভারী করবে।

১. রাজস্ব কাঠামোর খতিয়ান: ভ্যাটের আধিপত্য

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক বা ৫০ শতাংশই আদায় করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে ভ্যাট থেকে। বর্তমানে অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকার বাজেটে ভ্যাটের অবদান রাখা হয়েছিল ৪০ শতাংশ। আগামীতে এটি ১০ শতাংশ বাড়িয়ে অর্ধেক করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত রাজস্ব উৎসের সম্ভাব্য বণ্টন:

  • মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট): ৫০ শতাংশের বেশি।

  • আয়কর (প্রত্যক্ষ কর): ৩৮ শতাংশ।

  • কাস্টমস ডিউটি: ১১ শতাংশ।

  • অন্যান্য: ১ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, সরকার তার ব্যয় মেটানোর জন্য প্রত্যক্ষ কর বা ধনীদের আয়ের ওপর করের চেয়ে পরোক্ষ কর বা সাধারণ মানুষের কেনাকাটার ওপর কর বসানোকেই সহজ উপায় হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

২. পরোক্ষ কর: গরিবের বোঝা, ধনীর আশীর্বাদ?

অর্থনীতিতে পরোক্ষ করকে সাধারণত ‘রিগ্রেসিভ ট্যাক্স’ বা পশ্চাৎপদ কর বলা হয়। কারণ, এই কর ব্যবস্থায় একজন কোটিপতি এবং একজন দিনমজুরকে একই পণ্য কেনার সময় সমান হারে কর দিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, মোবাইল ফোন ব্যবহার, ওষুধ কেনা কিংবা গ্যাস-বিদ্যুতের বিল পরিশোধের সময় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট দেন।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, “পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভর করার অর্থ হলো গরিবের ওপর বোঝা চাপানো এবং ধনীদের পুরস্কৃত করা। এটি কর সাম্যের পরিপন্থী এবং এর ফলে সমাজে আয়বৈষম্য আরও প্রকট হয়।”

ক্যাম্পেইন ফর গুড গভর্নেন্স এবং অক্সফাম বাংলাদেশের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ভ্যাটের বোঝা গরিব মানুষের আয়ের ১২.১ শতাংশ, যেখানে ধনীদের ক্ষেত্রে এটি মাত্র ৫.৯ শতাংশ। অর্থাৎ আয়ের অনুপাতে একজন দরিদ্র মানুষ একজন ধনীর চেয়ে দ্বিগুণ করের বোঝা বহন করছেন।

৩. ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য ও গিনি কো-অফিসিয়েন্ট

দেশের সাধারণ মানুষের আয় বাড়লেও সম্পদের সুষম বণ্টন না হওয়ায় আয়বৈষম্য আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিবিএস-এর হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে ২০২২ অনুযায়ী, দেশের গিনি কো-অফিসিয়েন্ট (যা দিয়ে আয়বৈষম্য মাপা হয়) দাঁড়িয়েছে ০.৪৯৯৯-এ। অথচ ২০১০ সালে এটি ছিল ০.৪৫৮ এবং ২০১৬ সালে ০.৪৮২। গিনি সূচক ০.৫ এর কাছাকাছি পৌঁছানোর অর্থ হলো দেশের সম্পদ একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। ভ্যাট-নির্ভর বাজেট এই বৈষম্যকে আরও উসকে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

৪. কর-জিডিপি অনুপাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত হতাশাজনক। ২০১১ সালে এটি ছিল ৯.২ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অথচ এই সময়ে মাথাপিছু আয় ৯৪০ ডলার থেকে বেড়ে ২,৭৬৫ ডলারে উন্নীত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “গত এক দশকে গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপর থাকলেও রাজস্ব আদায় সেই গতিতে বাড়েনি। এর প্রধান কারণ কর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি এবং কর ফাঁকি রোধে ব্যর্থতা।” এনবিআর কর্মকর্তাদের একটি অংশ প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিদের কর ফাঁকিতে সহায়তা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

৫. অটোমেশন ও নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্য

বর্তমান পরিস্থিতিতে এনবিআর কর ফাঁকি রোধে এবং পরিপালন নিশ্চিত করতে অটোমেশনের ওপর জোর দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১.১২ কোটি ই-টিআইএনধারী থাকলেও তাদের অর্ধেকই রিটার্ন জমা দেন না। অন্যদিকে, বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকার বেশি এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও বর্তমানে মাত্র ৮ লাখ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত। এনবিআর আগামী অর্থবছর থেকে এই সংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হাতে নিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যদি নীতিগত দুর্বলতা এবং কর ফাঁকি পুরোপুরি বন্ধ করা যায়, তবে বর্তমানে যা ভ্যাট আদায় হয় তার চেয়ে তিন গুণ বেশি আদায় করা সম্ভব।

৬. নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এই প্রথম বাজেটকে একটি এসিড টেস্ট হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনী ইশতেহারে জনকল্যাণ ও বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাজেটে পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরশীলতা সেই প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন, কেবল সাধারণ মানুষের পকেট থেকে ভ্যাট আদায় না করে সরাসরি আয়কর আদায়ের পরিধি বাড়ানো এবং কর প্রশাসনের দুর্নীতি দূর করা উচিত।

উপসংহার

৬ লাখ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সরকারকে কেবল সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ দিলেই হবে না, বরং করের জাল বড় করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কর ব্যবস্থা সহজ করা এবং বড় করদাতাদের ফাঁকি দেওয়ার পথ বন্ধ করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যথায়, ‘উন্নয়ন’ কেবল একটি বিশেষ শ্রেণির জন্য হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠবে।


এক নজরে প্রস্তাবিত রাজস্ব কাঠামো (২০২৬-২৭)

২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা

রাজস্ব খাত অবদানের হার (%)
মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ৫০%+
আয়কর (প্রত্যক্ষ কর) ৩৮%
কাস্টমস ডিউটি ও অন্যান্য ১২%
মোট সম্ভাব্য রাজস্ব ৬,০০,০০০ কোটি টাকা
* তথ্যসূত্র: অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর প্রাক্কলন (এপ্রিল ২০২৬)


এ জাতীয় আরো খবর...