বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব এক ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করেছে। হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা বলছেন, কেবল হাম নয়; হামের সংক্রমণের পর নিউমোনিয়া এবং তীব্র অপুষ্টি শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার তিনটি প্রধান হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের তথ্য বিশ্লেষণে এক মর্মান্তিক চিত্র উঠে এসেছে। দেখা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের প্রায় ৯০ শতাংশের মৃত্যুই হয়েছে নিউমোনিয়া ও অপুষ্টিজনিত জটিলতার কারণে। এর চেয়েও বড় ও ভয়াবহ তথ্যটি হলো—হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসা শিশুদের ৭৪ শতাংশই কোনো টিকা পায়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যগুলোও এই একই বিপদের দিকে নির্দেশ করছে। টিকার এই বিশাল ঘাটতি এবং অপুষ্টির কারণে হামের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ আজ দেশের শিশুদের জন্য সাক্ষাৎ যমদূতে পরিণত হয়েছে।
তিন হাসপাতালের ভয়াবহ চিত্র ও পরিসংখ্যান
রাজধানী ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ৬৬ শিশুর তথ্য নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই তিন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল প্রায় ৬ হাজার ৪০০ শিশু। এর মধ্যে মারা যাওয়া শিশুদের বড় অংশই ছিল টিকাবঞ্চিত।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রতি তিন শিশুর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে ভর্তির মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। আর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু। এই দ্রুত মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা বলছেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে রোগীরা যখন একেবারে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকায় পৌঁছায়, তখন চিকিৎসকদের আর তেমন কিছু করার থাকে না।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ১৮ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম। ৫০ শতাংশ শিশুর বয়স সাত থেকে ১০ মাস এবং বাকি ৩২ শতাংশের বয়স এক বছরের বেশি। মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে নিউমোনিয়া ও অপুষ্টির কারণে। অন্য যারা মারা গেছে, তাদের ৩৩ শতাংশের ক্ষেত্রে মেনিনগোএনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের আবরণের প্রদাহ) এবং ২২ শতাংশের ক্ষেত্রে সেপটিসেমিয়ার (রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া) মতো মারাত্মক ও প্রাণঘাতী জটিলতা দেখা গেছে।
হাম ও নিউমোনিয়ার মরণঘাতী যুগলবন্দী
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ এফ এম আসামা খান জানিয়েছেন, হামে আক্রান্ত অবস্থায় নিউমোনিয়া শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। অধিকাংশ শিশুই মারাত্মক শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসে, আর পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাদের নিউমোনিয়া শনাক্ত হয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা যথাযথ না হওয়ায় ঢাকা পাঠাতে পাঠাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তিনি তার অতীতের এক গবেষণার বরাত দিয়ে জানান, হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রতি ২০ জনের মধ্যে অন্তত একজন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে এবং আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণই এই নিউমোনিয়া।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল ডা. লতিফা রহমানও একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি একটি বড় সমস্যা। এর সঙ্গে নিউমোনিয়া যুক্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মৃত্যুর মূল কারণ নিউমোনিয়া। প্রাথমিক পর্যায়ে অক্সিজেন সাপোর্ট নিশ্চিত করা গেলে অনেক মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হলেও প্রান্তিক পর্যায়ে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না।
তীব্র অপুষ্টি ও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন বন্ধের প্রভাব
হামের বিস্তারের পেছনে অপুষ্টি এক বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা (অংশীদারিত্ব ও কৌশল-জনস্বাস্থ্য) এবং পুষ্টি বিশেষজ্ঞ মো. ফেরদৌস বলেন, দেশে শিশুদের অপুষ্টিজনিত সংকট এখনো প্রকট। অনেক শিশু তীব্র অপুষ্টিতে (সিভিয়ার অ্যাকিউট মালনিউট্রিশন বা এসএএম) ভুগছে। বিশেষ করে গত দেড় বছরে এ ধরনের অপুষ্টির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্তদের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ১২ গুণ বেশি। অপুষ্টি প্রতিরোধে আগে বছরে দুইবার ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন চালানো হতো। প্রায় আড়াই কোটি শিশুকে এই ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে এই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কেনার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও তা হাতে পেতে আরও অন্তত ছয় মাস লাগতে পারে। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়, যার ফলে হামের ভাইরাস সহজেই শিশুদের শরীরে বাসা বাঁধে এবং অন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রে ঘা বা ক্ষত তৈরি করে জটিলতা বাড়ায়।
৭৪ শতাংশ শিশুর টিকাবঞ্চিত থাকার নেপথ্য কারণ
দেশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় কারণ হলো টিকার ঘাটতি। দেশে হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি। আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ প্রথম ডোজ নিয়েছিল এবং ১২ শতাংশ দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমিত হয়েছে।
নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) বিঘ্ন ঘটা, টিকার অভাব এবং সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচির অভাবেই সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেলথ ম্যানেজার (ইম্যুনাইজেশন) ডা. রিয়াদ মাহমুদ জানান, গত ৫ এপ্রিল একযোগে ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ইতিমধ্যে তিন সপ্তাহ পার হয়েছে। যেসব উপজেলায় এই কর্মসূচি চালানো হয়েছে, সেখানে নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমএনসিএএইচ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, দেশে হাম প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা গেছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৬১ শতাংশ। নির্দিষ্ট উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ হার ৯২ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ইপিআই টিকাদান ৮৫ শতাংশ নিশ্চিত করা গেলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই ইমিউনিটি গ্যাপ বা ঘাটতি রয়ে গেছে। এর একটি বড় কারণ হলো, অন্যান্য টিকা ৯ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হলেও হামের দ্বিতীয় ডোজ দিতে অপেক্ষা করতে হয় ১৫ মাস পর্যন্ত। এছাড়া গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘট, কভিডের প্রভাব এবং সম্পূরক টিকাদানের অভাব এই গ্যাপকে আরও বড় করেছে।
উপেক্ষিত সুপারিশ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দেশের বেশিরভাগ জেলাই এখন ঝুঁকির মুখে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে মহামারি ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, টিকাদান ছাড়াও অন্যান্য মহামারি ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপে প্রকট ঘাটতি রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারি মোকাবিলার মৌলিক ধাপ—কেস ফাইন্ডিং (রোগী খোঁজা), সমন্বিত চিকিৎসা প্রটোকল, ব্যাপক পরীক্ষা, আইসোলেশন ও জনসচেতনতা—যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দেওয়ার পর সরকারের জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা উচিত ছিল। এতে একদিকে যেমন সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যেত, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো যেত।
গত ১২ এপ্রিলের এক যৌথ সভা থেকে বিশেষজ্ঞরা মহামারি মোকাবিলায় বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু সেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হতে দেখা যাচ্ছে না বলে জানান জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক মো. মঈনুল আহসান বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্তা পাওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে লিখিত সুপারিশ চাওয়া হয়েছে। সুপারিশ পেলে পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও আইসোলেশন সংকট
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, দেশে নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যুর পরিস্থিতি নতুন নয়। তবে মৃত্যুহার কমাতে দীর্ঘদিন ধরে বড় কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নিউমোনিয়াসহ জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ সেবা দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জামের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একটি আক্রান্ত শিশু থেকে ১৫-১৮ জন সুস্থ শিশু সংক্রমিত হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে সব হাসপাতালে আইসোলেশন ব্যবস্থা চালু না থাকায় আক্রান্তদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের সুযোগ নেই। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে।
উপসংহার ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
হাম, নিউমোনিয়া এবং অপুষ্টির এই ভয়াবহ মৃত্যুচক্র ভাঙতে হলে এখনই সরকারকে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, জরুরি ভিত্তিতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন পুনরায় চালু করে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যে ৭৪ শতাংশ শিশু এখনো টিকার বাইরে রয়ে গেছে, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে দেশব্যাপী ‘ক্যাচ-আপ’ ক্যাম্পেইন বা সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে শিশুদের নিউমোনিয়া চিকিৎসায় অক্সিজেন সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুরা একটি জাতির ভবিষ্যৎ। হামের মতো একটি টিকাদানের মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। অবহেলা, টিকার ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগকে এখনই সর্বোচ্চ জরুরি ভিত্তিতে কাজ করতে হবে, যাতে হামের থাবায় আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয়।