রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:২২ অপরাহ্ন

কাপাসিয়ায় ৫ খুনের নেপথ্যে কী? মরদেহের পাশের রহস্যময় কাগজ ও ঘাতকের সেই রহস্যময় ফোন কল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩৪ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রাম। ঘড়ির কাঁটায় তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। পাখিদের কলকাকলিতে গ্রামটি জেগে ওঠার কথা থাকলেও আজ সেখানে এক ভয়ংকর নৈশব্দ্য। মে মাসের ৯ তারিখের সকালটি এই জনপদের জন্য এক অভিশপ্ত বার্তা নিয়ে আসে। একটি সাধারণ ভাড়া বাড়ি, যেখানে গত চার মাস ধরে বসবাস করছিল এক অভিবাসী পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু দরজার ওপারে যা অপেক্ষা করছিল, তা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ।

রক্তের স্রোতে ভেসে যাওয়া সেই ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল পাঁচটি নিথর দেহ। তবে এটি কেবল একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড ছিল না; এর পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিল শীতল রহস্যের ছোঁয়া। মরদেহের পাশে পড়ে থাকা রহস্যময় মুদ্রিত কাগজ আর ঘাতকের সেই একটি ফোন কল—সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর থ্রিলারের চেয়েও লোমহর্ষক এক বাস্তবতার মুখোমুখি পুরো জেলা।

রক্তাক্ত সেই কক্ষ ও পৈশাচিক দৃশ্য

খুনি যখন পরিকল্পনা সাজায়, তখন সে কতটা নিখুঁতভাবে তার জিঘাংসা চরিতার্থ করে, তার প্রমাণ মিলল এই অকুস্থলে। ঘাতক ফোরকান মিয়া পেশায় একজন ট্রাকচালক। কিন্তু সেই রাতে তিনি চালকের আসন ছেড়ে যেন এক জল্লাদের রূপ নিয়েছিলেন। বাড়িতে প্রবেশ করতেই দেখা যায় স্ত্রী শারমিনের মরদেহ। তবে তাকে হত্যার আগে যে পৈশাচিকতা চালানো হয়েছে, তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। জানালার গ্রিলের সঙ্গে রশি দিয়ে হাত-পা পেঁচিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল তাকে। দীর্ঘক্ষণ নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করা হয়।

পাশে পড়ে ছিল তিনটি নিস্পাপ মুখ—১৬ বছরের মিম, ৮ বছরের মারিয়া আর মাত্র ২ বছরের ফারিয়া। বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থাতেই তাদের গলায় ধারালো অস্ত্রের পোঁচ বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ঘরের অন্য প্রান্তে ছিল শ্যালক রসুল। নিজের আপন শ্যালককে ফোন করে ‘চাকরি দেওয়ার’ লোভ দেখিয়ে গোপালগঞ্জ থেকে ডেকে এনেছিলেন ফোরকান। অথচ সেই চাকরির প্রতিশ্রুতি ছিল আসলে এক মৃত্যুকূপের আমন্ত্রণ।

মরদেহের পাশে রহস্যময় সেই ‘কাগজ’

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে একটি বিশেষ আলামত। মরদেহের তিন জায়গায় যেখানে লাশগুলো স্তূপ করা ছিল, প্রতিটি দেহের ঠিক পাশেই একটি করে প্রিন্ট করা কাগজ পাওয়া গেছে। এই কাগজগুলো আসলে কী? পুলিশ প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখেছে, এগুলো কিছু মামলার নথিপত্র। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন খুনি কেন তার নিজের স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার পর মরদেহের পাশে আইনি নথিপত্র সাজিয়ে রাখবে?

রহস্যের গভীরতা এখানেই। এটি কি কোনো বার্তা? নাকি কোনো পুরনো আক্রোশের প্রতীক? ফোরকান কি কাউকে কিছু বোঝাতে চেয়েছিলেন? নাকি তিনি নিজেকে কোনো বড় ‘অন্যায়’ বা ‘প্রতারণার’ শিকার ভেবে এই নারকীয় ‘বিচার’ সম্পন্ন করেছেন? নথিপত্রগুলো কোনো আদালতের রায় বা চলমান মামলার কাগজপত্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই কাগজগুলো খুনের মোটিভ বা কারণ উদ্ঘাটনের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হতে পারে। কোনো কোনো গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, ফোরকান হয়তো চেয়েছিলেন যারা এই মরদেহ উদ্ধার করবে, তারা যেন এই কাগজগুলো দেখে খুনের কারণ বুঝতে পারে।

সেই একটি ফোন কল: পিশাচের স্বীকারোক্তি

হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর ফোরকান কিন্তু পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেননি। বরং তিনি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় এক আত্মীয়কে ফোন করেন। ফোনের ওপাশে থাকা সেই আত্মীয় যখন রিসিভ করেন, ফোরকানের কণ্ঠে কোনো কাঁপন ছিল না, ছিল না কোনো অনুশোচনা। তিনি শুধু জানিয়ে দেন, “শারমিনসহ পরিবারের পাঁচজনকে আমি শেষ করে দিয়েছি। ঘর থেকে লাশগুলো সরিয়ে নিস।”

এই একটি ফোন কলই পুলিশের কাছে প্রমাণ করে দেয় যে, ঘাতক ফোরকান এটি কোনো ক্ষণিকের উত্তেজনায় করেননি। বরং এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত ও স্থির মস্তিষ্কের হত্যাযজ্ঞ। ফোন করার পর তিনি নিজের মোবাইলটি বন্ধ করে অন্ধকারের মধ্যে উধাও হয়ে যান। ট্রাকচালক হওয়ার সুবাদে সারা দেশের অলিগলি তার চেনা। তাই পুলিশের ধারণা, তিনি হয়তো এখন কোনো মহাসড়কের ট্রাকে কিংবা দুর্গম কোনো এলাকায় পালিয়ে আছেন।

মাদক, যৌতুক নাকি কোনো গোপন প্রতিহিংসা?

শারমিনের স্বজনদের দাবি, ফোরকান দীর্ঘকাল ধরে যৌতুকের জন্য শারমিনের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। ফোরকানের মাদকাসক্তির বিষয়টিও এখন প্রকাশ্যে। ঘর থেকে মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন জাগে, শুধু যৌতুক বা মাদকের নেশায় কি কেউ নিজের ২ বছরের শিশুসন্তানকে অবলীলায় জবাই করতে পারে?

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, ফোরকানের মনে হয়তো দীর্ঘদিনের কোনো ক্ষোভ বা সন্দেহ বাসা বেঁধেছিল। শ্যালককে প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে আনা প্রমাণ করে যে, তিনি পুরো শ্বশুরকুলকে নির্মূল করার এক নীল নকশা তৈরি করেছিলেন। শ্যালক রসুল ছিল তার বোন শারমিনের একমাত্র ভরসা। রসুলকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে মূলত শারমিনকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করেছিলেন ফোরকান, যাতে সেই রাতে বাড়িতে অন্য কারও আনাগোনা বা সতর্কতা না থাকে।

তদন্ত ও ভবিষ্যৎ প্রশ্ন

গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীনের নেতৃত্বে একাধিক তদন্ত সংস্থা এখন এই রহস্যের কিনারা করতে কাজ করছে। ফরেনসিক দল বাড়িটি সিলগালা করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন অনেক প্রশ্ন—ঘাতক ফোরকান কি একাই এই কাজ করেছেন? নাকি মরদেহের পাশে ওই মামলার কাগজপত্র রাখার পেছনে অন্য কোনো অদৃশ্য হাতের যোগসূত্র রয়েছে? ওই কাগজগুলো কি ফোরকানের বিরুদ্ধে কোনো মামলার ছিল, নাকি শারমিনের পরিবারের অন্য কারও?

এই হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা কাপাসিয়ার মাটি অনেকদিন মনে রাখবে। একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে স্রেফ এক পাষণ্ডের জিঘাংসায়। ফোরকান এখন পলাতক, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই রহস্যময় কাগজ আর পৈশাচিক ফোন কলটি এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু। পুলিশ বলছে, ঘাতক ফোরকানকে গ্রেপ্তার করা গেলেই বেরিয়ে আসবে কেন তিনি মরদেহের পাশে সেই রহস্যময় নথিপত্রগুলো রেখে গিয়েছিলেন এবং কী এমন আক্রোশ ছিল যার মূল্য দিতে হলো তিনটি নিস্পাপ শিশুকে।

রাউৎকোনা গ্রামের সেই ঘরটি এখন শুনশান, কিন্তু বাতাসের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে যেন মিশে আছে ২ বছরের ফারিয়ার শেষ চিৎকার। সমাজের অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকা এমন অপরাধীরা কখন কার পরিবারে থাবা বসাবে, তা ভেবেই এখন শিউরে উঠছে মানুষ। রহস্য আর বীভৎসতার এই মিশেলে কাপাসিয়া ৫ খুন মামলাটি এখন এক বড় জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...