রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:২২ অপরাহ্ন

আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের জালে বাংলাদেশ ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নভাবে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো এত বিস্তৃত আইনি তদন্তের নজির অন্য কোথাও নেই। লেবানন, অ্যাঙ্গোলা কিংবা জার্মানির মতো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ বা সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট একক অভিযোগের নজির থাকলেও, একযোগে ৩ জন সাবেক গভর্নরসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘটনা বিরল। ২০০৯ সাল-পরবর্তী দেড় দশকজুড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকারী তিন গভর্নরের বিরুদ্ধেই বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালাচ্ছে। এই তদন্তের জালে সাবেক গভর্নরদের পাশাপাশি জড়িয়েছেন বিভিন্ন সময়ের ৭ জন ডেপুটি গভর্নর, বেশ কয়েকজন নির্বাহী পরিচালকসহ অন্তত ৫৫ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এদের বিরুদ্ধে মামলা, সম্পদ জব্দ, নথিপত্র তলব ও গ্রেফতারের মতো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আর্থিক খাতের এই কেলেঙ্কারির তদন্তে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার (এস কে) সুর চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস। অন্যদিকে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও আব্দুর রউফ তালুকদার বর্তমানে লোকচক্ষুর অন্তরালে বা হদিসহীন অবস্থায় রয়েছেন। এই বিষয়ে সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কোনো নীতি গ্রহণ বা টেকনিক্যাল কারণে খেলাপি ঋণ বাড়তেই পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনিয়ম-দুর্নীতির সহযোগী হয়ে পড়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে বিরল। তিনি মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরে আগে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করলে জনগণের আস্থার ঘাটতি হওয়া স্বাভাবিক এবং পরপর তিন গভর্নর ও সব পরিচালকের তথ্য চাওয়া হলে সেটি বিদেশীদের কাছেও খারাপ বার্তা পাঠায়। সাবেক অর্থ সচিব এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, ২০০৯ সাল-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো গভর্নর স্বাধীন ছিলেন বলে মনে হয় না এবং সেখানে যা কিছু হয়েছে তা রাষ্ট্র জিম্মি হয়ে যাওয়ার ফল। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে নানা ব্যাংক জালিয়াতি হলেও রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) কোনো গভর্নর বা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যক্তিগত দুর্নীতির দায়ে কখনও গ্রেফতার হননি; বরং রঘুরাম রাজন বা উর্জিত প্যাটেলের মতো গভর্নররা নীতিগত স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। একইভাবে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা বা নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানদের বিরুদ্ধেও ব্যক্তিগত আর্থিক অপরাধের বা ফৌজদারি বিচারের কোনো নজির নেই।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৯ সাল-পরবর্তী প্রায় আট বছর দায়িত্বে থাকা গভর্নর ড. আতিউর রহমানের আমলে বেসিক ব্যাংক লুণ্ঠন, সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি ও জনতা ব্যাংকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে রিজার্ভ চুরির কেলেঙ্কারির মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং বর্তমানে সিআইডির খসড়া চার্জশিটেও তাকে আসামি করা হয়েছে। এরপর সাবেক অর্থ সচিব ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদারের মেয়াদে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করার জন্য অনৈতিকভাবে বিশেষ নীতিগত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর দায়ে দুদক গত ১১ই জুন তিন সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করে ২০০৯ সাল-পরবর্তী ১৫ বছরের পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের যাবতীয় মেয়াদের নথিপত্র তলব করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই দীর্ঘমেয়াদি অনিয়মের খেসারত দিতে গিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত আজ চরম সংকটে। বর্তমানে দেশের অন্তত দুই ডজনেরও বেশি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে এবং গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে পারছে না প্রায় এক ডজন ব্যাংক। ২০০৯ সালে যেখানে দেশের মোট খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ তা বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকে। চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

বিপরীত চিত্রে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো তাদের ব্যাংক খাতকে সুরক্ষিত রেখেছে। বর্তমানে ভারতের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২.২ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫.৮ শতাংশ এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়া শ্রীলঙ্কার খেলাপি ঋণও এক অঙ্কের ঘরে সীমাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক ‘ব্যাসেল-৩’ নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) সর্বনিম্ন ১২.৫০ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও, গত বছর শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের গড় সিআরএআর ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে নেমে গেছে। যেখানে পাকিস্তানের সিআরএআর এখন প্রায় ২১ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১৯ শতাংশ এবং ভারতের ১৭.২০ শতাংশ। কোনো কার্যকর অর্থনীতির গড় মূলধন পর্যাপ্ততা এভাবে ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে আর্থিক খাতের জন্য গভীর উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...