চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া অন্তত ৫১৯ জন বন্দীকে ঘটনার দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, পলাতক এসব আসামির মধ্যে ১৮২ জনের কোনো পরিচয়, মামলার বিবরণ বা সুনির্দিষ্ট অপরাধের তথ্য কারা অধিদপ্তরের ডিজিটাল বা অফলাইন কোনো নথিতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নরসিংদী ও শেরপুর জেলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া এই শনাক্তহীন কয়েদিরা এখন জনসমাজে প্রকাশ্যে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও নথিপত্র না থাকায় তাদের পলাতক হিসেবে গ্রেপ্তার বা চিহ্নিত করার কোনো পথ খোলা নেই।
কারা অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, জুলাই ও আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালে কারাগারগুলোতে যে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল, তাতে প্রশাসনিক সার্ভার এবং হার্ডকপি নথিপত্র সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। ফলে নিখোঁজ থাকা এই ১৮২ জন ব্যক্তি আদৌ কোনো হত্যা বা রাষ্ট্রবিরোধী মামলার সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি ছিলেন, নাকি সাধারণ ধারার বিচারাধীন আসামি—তা যাচাই করার ন্যূনতম প্রমাণাদি কারা কর্তৃপক্ষের হাতে নেই। এই শনাক্তহীনদের মধ্যে দেড় শতাধিক বন্দী কেবল নরসিংদী কারাগার থেকেই পালিয়েছিলেন, বাকিরা শেরপুর কারাগারের অন্তরীণ ছিলেন। আদালতের হাজার হাজার পুরোনো নথি ধরে ব্যক্তিপর্যায়ে অনুসন্ধান চালানো তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে তা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ।
কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানিয়েছেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় কারাগার ভেঙে পালানো কয়েদিদের একটি বড় অংশকে এখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তাদের অনেকে হয়তো ইতিমধ্যে ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। তবে যাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তৎপর রয়েছে। কিন্তু যে ১৮২ জনের নথিপত্র হামলা ও অগ্নিকাণ্ডে চিরতরে হারিয়ে গেছে, তাদের বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে দেশের পাঁচটি কারাগারে সমন্বিত হামলা ও বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ওই নজিরবিহীন ঘটনায় মোট ২ হাজার ২৪০ জন বন্দী কারাগার থেকে পালিয়ে যায়। সহিংসতা চলাকালে বিভিন্ন কারাগারে ১৬ জন বন্দী নিহত হন, যার মধ্যে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে ছয়জন, জামালপুরে সাতজন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুজন এবং চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে একজন কয়েদি প্রাণ হারান। ঘটনার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণ আত্মসমর্পণের সুযোগ দিলে এবং পরবর্তীতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভিযানের মুখে অনেকেই ধরা পড়েন বা আত্মসমর্পণ করেন। তবে ৫১৯ জন বন্দী এখনো পুরোপুরি নিখোঁজ রয়েছেন।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে কয়েক হাজার মানুষের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। ওই সময় কারাগারের তালা ভেঙে ৯ জন দুধর্ষ জঙ্গিসহ মোট ৮২৬ জন বন্দী পালিয়ে যায়। কার্যালয়ের কম্পিউটার ব্যবস্থা ও প্রধান রেজিস্টার পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় বন্দীদের ডিজিটাল ডেটাবেজ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়। একই সাথে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতেও অগ্নিসংযোগের কারণে নথিপত্র বিনষ্ট হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকেও এই আসামিদের পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
শুধু বন্দী পলায়নই নয়, নরসিংদী ও শেরপুর কারাগার থেকে সে সময় ৯৪টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় ১০ হাজার রাউন্ড গুলি লুট করা হয়েছিল। উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৬৬টি অস্ত্র এবং প্রায় ১ হাজার ৮০০টি গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো ২৮টি অস্ত্র এবং সাড়ে সাত হাজারের বেশি গুলি অপরাধী চক্র বা সাধারণ মানুষের হাতে ছড়িয়ে রয়েছে, যা উদ্ধার করা যায়নি।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুলসংখ্যক চিহ্নিত ও অচিহ্নিত অপরাধী দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে থাকা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। যেসব আসামির অতীত অপরাধের রেকর্ডই হারিয়ে গেছে, তারা সমাজে নতুন কোনো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করলেও তাদের শনাক্ত করা দুরূহ হবে। আইনের শাসন বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অবিলম্বে বিচার বিভাগীয় নথিপত্রের সাথে বিশেষ সমন্বয় সেল গঠন করে এই শনাক্তহীন পলাতকদের পরিচয় উদ্ধার ও গ্রেপ্তার করা অত্যন্ত জরুরি।