দেশের ব্যাংকিং খাতে এখন এক নতুন সমীকরণ দৃশ্যমান। সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত একটি ব্যাংককে কতটা উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে, আর নিয়মের ব্যত্যয় ও তারল্য সংকট একটি বড় ব্যাংককে কীভাবে খাদের কিনারে ফেলতে পারে—তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ তৈরি হলো চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ)। দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংক ব্র্যাক ব্যাংক যখন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়সহ (সমন্বিত হিসাবে) রেকর্ড ৫৭৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা ঘরে তুলেছে, ঠিক তখনই দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বড় ধরনের সংকটে পড়ে ২৮৮ কোটি টাকার বিশাল লোকসান গুনেছে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক দুটির প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বিশ্লেষণ করে এই বিপরীতমুখী চিত্র পাওয়া গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দুই ব্যাংকের পারফরম্যান্স আসলে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতেরই বর্তমান প্রতিচ্ছবি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৪টি ব্যাংক তাদের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ২৪টি ব্যাংকের মধ্যে ২০টি ব্যাংক কম-বেশি মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে। এই ২০টি ব্যাংকের সম্মিলিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা (সমন্বিত), যা গত বছরের একই সময়ের (১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা) তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। লোকসান করা ৪টি ব্যাংকের সম্মিলিত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। গত বছর এই ব্যাংকগুলোর লোকসান ছিল মাত্র ৯৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসানের পাল্লা আশঙ্কাজনকভাবে ভারী হয়েছে। লোকসানের শীর্ষে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক (১,১৩৩ কোটি টাকা)। এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংক ৮৬১ কোটি এবং এবি ব্যাংক ৮২৬ কোটি টাকা লোকসান রেকর্ড করেছে।
প্রথম প্রান্তিকে ব্র্যাক ব্যাংক ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতি শেয়ারের বিপরীতে ২ টাকা ৯০ পয়সা মুনাফা (ইপিএস) অর্জন করেছে, যা আগের বছর ছিল ২ টাকা ০২ পয়সা। ব্র্যাক ব্যাংকের এই সাফল্যের পেছনে মূলত দুটি কৌশল কাজ করেছে:
১. ঋণের বিপরীতে সুদ আয় বৃদ্ধি: বাজারে ঋণের চাহিদা কিছুটা কম থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকটি তাদের পোর্টফোলিও দক্ষতার সাথে সামলেছে।
২. নিরাপদ খাতে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ: অতিরিক্ত তারল্য অলস বসিয়ে না রেখে ব্যাংকটি সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করেছে, যেখান থেকে বড় অঙ্কের নিশ্চিত মুনাফা এসেছে। এছাড়া কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ খাত থেকেও তাদের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
অন্যদিকে, দেশের বৃহত্তম ব্যাংক হওয়া সত্ত্বেও ইসলামী ব্যাংকের ২৮৮ কোটি টাকার লোকসানের কারণ হিসেবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দুটি প্রধান বিষয় উল্লেখ করেছে। প্রথমত, সাম্প্রতিক সময়ে আমানতকারীদের ধরে রাখতে বা আকৃষ্ট করতে আমানতের বিপরীতে মুনাফার (সুদের) হার বাড়াতে হয়েছে, যার ফলে ব্যাংকের ‘কস্ট অব ফান্ড’ বা তহবিল ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের খেলাপি বিনিয়োগ বা মন্দ ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় আসেনি। এই দুইয়ের সাঁড়াশি চাপেই ব্যাংকটিকে বড় লোকসান গুনতে হলো।
টাকার অঙ্কে ব্র্যাক ব্যাংক এগিয়ে থাকলেও, শতকরা হিসেবে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। প্রথম প্রান্তিকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ইপিএস দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৭০ পয়সায়, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৯২ পয়সা—অর্থাৎ মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯৩ শতাংশের বেশি!
মুনাফা প্রবৃদ্ধির দৌড়ে এর পরের অবস্থানেই রয়েছে দি সিটি ব্যাংক, তাদের প্রবৃদ্ধি ১৫৯ শতাংশ (ইপিএস ১ টাকা ৫৮ পয়সা)। সাউথইস্ট ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয়ও গত বছরের ৪০ পয়সা থেকে বেড়ে ৯৯ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে।
বিপরীতে, মুনাফায় থাকলেও ৮টি ব্যাংকের আয় ছিল একেবারেই নামমাত্র (সর্বোচ্চ ২৯ পয়সা)। এই তালিকায় রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (৭ পয়সা) এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক (২ পয়সা)। এছাড়া ব্যাংক এশিয়া, ঢাকা ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের মুনাফাও গত বছরের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম প্রান্তিকের এই অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন পুরো খাতের জন্য একটি পরিষ্কার বার্তা। ব্যাংকিং খাতে কেবল আগ্রাসী ব্যাংকিং বা সাময়িকভাবে আকার বড় করলেই টেকসই হওয়া যায় না। দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে এবং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। যেসব ব্যাংক নিয়মের মধ্যে হেঁটেছে, সংকটেও তাদের মুনাফা বেড়েছে; আর যারা সুশাসনে পিছিয়ে ছিল, তারা এখন তারল্য সংকটে ধুঁকছে।
সূত্র: সমকাল