শেষ রাতের কুয়াশা ঢাকা নির্জন সড়ক ধরে যখন একটি রিকশা আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনে দিয়ে হাসপাতালের দিকে যাচ্ছিল, তখনো কেউ ভাবেনি কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সেখানে কী নারকীয় কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে। শাশুড়ির জীবন বাঁচাতে জরুরি চিকিৎসার টাকা নিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে চলা এক নারী পথেই আক্রান্ত হলেন একদল সশস্ত্র যুবকের দ্বারা। ব্যাগের ভেতরের সামান্য কিছু টাকা আর মোবাইল ফোন কেড়ে নিতে সাধারণ এই গৃহবধূর শরীরজুড়ে নির্মমভাবে ধারালো অস্ত্রের কোপ বসাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি তারা। রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় তাঁর নিথর দেহ যখন হাসপাতালের বিছানায় ঠাঁই পায়, তখন এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের চিরতরে বদলে যাওয়ার গল্প বলে না, বরং তা ঢাকার দুই কোটি মানুষের দৈনন্দিন আতঙ্কের এক জীবন্ত দলিল হয়ে ওঠে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথি এবং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকার অপরাধচিত্র এখন আর কেবল চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা সরাসরি প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৭৮ জন মানুষ অপরাধীদের নৃশংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। দাপ্তরিক হিসাবে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শতাধিক ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা রেকর্ড হলেও বাস্তব পরিস্থিতি এর চেয়ে বহুগুণ ভয়াবহ।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত অপরাধের একটি বড় অংশই কখনো পুলিশের খাতার অন্তর্ভুক্ত হয় না। এর প্রধান কারণ, সাধারণ মানুষ আইনি প্রক্রিয়া ও থানার চক্কর কাটার ভীতি থেকে দূরে থাকতে চান। অনেক সময় গুরুতর জখম হওয়ার পরও ভুক্তভোগীদের পরিবার মামলা না করে স্রেফ একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেই ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান।
নাগরিকদের এই অনীহার পেছনে প্রশাসনের এক শ্রেণীর কর্মকর্তাদের শীতল ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ অনেকাংশে দায়ী। রক্তাক্ত ভুক্তভোগীর পরিবার যখন গভীর রাতে থানায় মামলা করতে যায়, তখন অনেক সময়ই অপরাধীদের নাম-পরিচয় আগে থেকে দিতে না পারার অজুহাতে মামলা নিতে গড়িমসি করা হয়। এমনকি সিসিটিভি ক্যামেরার অনুপস্থিতি কিংবা ফুটেজ না পাওয়ার খোঁড়া যুক্তি দিয়ে অপরাধীদের খুঁজে বের করার দায় এড়ানোর চেষ্টা চলে। রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, শাহবাগ ও যাত্রাবাড়ীর মতো জনবহুল এলাকাগুলোর অলিগলি এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের ফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভোরবেলায় ট্রেন বা দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে যারা ঘরে ফেরেন কিংবা পোশাক কারখানার যেসব শ্রমিক সাতসকালে কাজের উদ্দেশ্যে বের হন, তারা এখন সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে কেবল এক সপ্তাহেই কয়েকশো অপরাধীকে গ্রেপ্তারের দাবি করা হলেও রাজপথের পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি ঘটছে না। এর পেছনের মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, অপরাধীদের একটি বড় অংশই গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিন পর আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিংবা মাদকের টাকা জোগাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
বর্তমানে অপরাধের ধরন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পেশাদার ডাকাত দল এবং মাদকাসক্তদের পাশাপাশি উচ্চবিত্ত বা তথাকথিত শিক্ষিত পরিবারের একদল বখে যাওয়া তরুণও এখন কেবল ‘অ্যাডভেঞ্চার’ ও শখের বশে দামি মোটরবাইক নিয়ে ঢাকার রাজপথে সাধারণ মানুষের মোবাইল ও ব্যাগ ছোঁ মেরে পালিয়ে যাচ্ছে। এই শৌখিন অপরাধ প্রবণতা সামাজিকভাবে পুরো সমাজকে এক চরম অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রাজধানীর রাজপথে যখন স্থানীয় অপরাধীদের তাণ্ডব চলছে, ঠিক তখনই দেশের সীমান্ত গলিয়ে প্রতিনিয়ত নিঃশব্দে ঘটে চলেছে মানব পাচারের মতো এক আন্তর্জাতিক ও সংগঠিত অপরাধ। দারিদ্র্য আর উন্নত জীবনের মিথ্যে মরীচিকার পেছনে ছুটে সীমান্ত পার হওয়া এই অসহায় নারীদের একটি বড় অংশের মূল গন্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের মহারাষ্ট্রের মুম্বাই শহর।
বিগত দুই দশকের আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১০ থেকে ২০ হাজার নারী ও শিশু অবৈধ উপায়ে সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের অন্ধকার জগৎ এবং অবৈধ শ্রম বাজারে প্রায় দুই থেকে তিন লাখ পাচার হওয়া বাংলাদেশি নারী অত্যন্ত অমানবিক ও বন্দি জীবনযাপন করছেন।
পাচারকারী ও দালাল চক্রগুলো এখন আর কেবল প্রথাগত চাকরির কথা বলে নারীদের ফাঁদে ফেলছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন ডেটিং অ্যাপ এবং টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণীদের ‘মডেলিং’ বা ‘বিউটি পার্লারে’ আকর্ষণীয় ক্যারিয়ারের লোভ দেখানো হচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের যেসব দুর্গম অঞ্চলে কাঁটাতারের বেড়া নেই কিংবা ছোট নালা ও খালের মতো ভৌগোলিক দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলোকে রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কোনো বৈধ পাসপোর্ট বা নাগরিকত্বের নথিপত্র ছাড়া সীমান্ত পার করার পরপরই এই নারীদের বন্দি করা হয় এবং মুম্বাইয়ের নিষিদ্ধ পল্লীগুলোতে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
ভারতের বিভিন্ন এনজিও ও আদালতের নির্দেশে মাঝেমধ্যে এসব নারীদের উদ্ধার করা হলেও, তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি এক দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক জটে আটকে থাকে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিশ্চিতকরণের (Nationality Verification) ধীরগতির কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বছরের পর বছর আলোর মুখ দেখে না।
ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বা তার কাছাকাছি সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করার অনুরোধ ঢাকার প্রশাসনিক টেবিলে ঝুলে রয়েছে, যার মধ্যে কিছু অনুরোধ পাঁচ বছরেরও বেশি পুরনো। এই আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া নারীদের ভারতের বিভিন্ন সেফ হোম বা ডিটেনশন সেন্টারে দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে হয়।
মানব পাচার ও অবৈধ অনুপ্রবেশের এই সামগ্রিক সংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ ও বৈধ ভ্রমণকারীদের ওপর। বর্তমানে পর্যটক ভিসা প্রায় অবরুদ্ধ থাকায় বহু বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার জন্য ‘মেডিক্যাল ভিসা’ নিয়ে ভারতে যাচ্ছেন। কিন্তু ভিসার ক্যাটাগরির কঠোর শর্ত এবং নজরদারির কারণে অনেকেই সেখানে গিয়ে চরম হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। নির্ধারিত শহরের বাইরে গিয়ে পর্যটন এলাকায় ভ্রমণ করতে গিয়ে কিংবা সামান্য আইনি কড়াকড়ি মেনে না চলার কারণে অনেক বৈধ বাংলাদেশিকে ‘ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের’ দায়ে আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত অপরাধ—এই দুই সংকট আসলে একই সুতোয় গাঁথা, যার মূল শিকার দেশের সাধারণ এবং প্রান্তিক মানুষ। ঢাকার রাস্তায় সাধারণ মানুষের নিরাপদে হাঁটার অধিকার যেমন নিশ্চিত করা জরুরি, ঠিক তেমনি সীমান্তের ওপারে পাচার হয়ে যাওয়া দেশের মা-বোনদের ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, কিশোর গ্যাং ও মাদক সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ঝুলে থাকা দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক জট দ্রুত নিরসন করার মাধ্যমেই কেবল এই দ্বিমুখী সংকট থেকে নাগরিকদের মুক্তি দেওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ