সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১২:১৯ পূর্বাহ্ন

বেসরকারি চাকরিজীবীদের কথা ভাববে কে?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

আগামী ১লা জুলাই থেকে দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য শুরু হচ্ছে এক নতুন উৎসবের আমেজ। দীর্ঘ ১১ বছর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত হতে যাচ্ছে নতুন পে স্কেল। তবে এই উৎসবের আলোর ঠিক বিপরীত পাশেই ভর করেছে এক নিদারুণ ও নীরব হাহাকার। সরকারি খাতের এই বেতন বৃদ্ধির ঘোষণার মূহূর্তে দেশের কোটি কোটি বেসরকারি চাকুরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন—‘আমাদের কথা আসলে কে ভাবছে?’

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে স্কেল ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে। নতুন এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপে, আগামী ১লা জুলাই থেকে বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ দেওয়া হবে এবং বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে। নতুন বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সরকারি খাতের সর্বনিম্ন অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে এক লাফে ১৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিশাল বর্ধিত বেতনভাতা পরিশোধের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নতুন বাজেটে আলাদাভাবে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

প্রকট বৈষম্য ও সামাজিক মর্যাদা সংকট

সরকারি খাতে যখন এই বিপুল বেতন বৃদ্ধির উৎসব চলছে, তখন দেশের মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতের চিত্রটি অত্যন্ত অন্ধকার। দেশের হাজার হাজার বেসরকারি ও প্রাইভেট কোম্পানিতে নিয়োজিত কর্মীরা তীব্র তাপদাহ ও প্রতিকূলতার মাঝে প্রতি মাসে মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় দিনরাত ঘাম ঝরাচ্ছেন। আগামী মাস থেকে একজন সরকারি কর্মচারীর সর্বনিম্ন বেতন যখন ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাবে, তখন অনেক বেসরকারি কর্মীর পুরো মাসের উপার্জন থাকবে সেই ন্যূনতম সরকারি বেতনের অর্ধেকেরও কম। বেসরকারি খাতের এই বিপুল শ্রমশক্তির কোনো পেনশন নেই, চাকরির কোনো আইনি নিরাপত্তা বা নিশ্চয়তা নেই; মাস শেষে তাদের ভাগ্যে জোটে কেবল একটি সীমিত বেতনের খাম। এই চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়, তবে প্রতিবার নতুন পে স্কেল ঘোষণার পর এই ব্যবধান আরও বেশি প্রকট ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, যা সামাজিক ও কর্মক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের মর্যাদাকে এক ধাক্কায় আরও নিচে নামিয়ে দেয়।

উৎপাদনমুখী শ্রমশক্তি এখন ‘পরীক্ষামুখী’

সমাজ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যকার এই পর্বতসম বৈষম্য দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থান ও যুবসমাজের মনস্তত্ত্বে এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই বৈষম্য যত বৃদ্ধি পাবে, দেশের লক্ষ লক্ষ উচ্চশিক্ষিত তরুণ তত বেশি বেসরকারি খাতের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বা উপেক্ষা করে স্রেফ একটি সরকারি চাকরির পেছনে উঠেপড়ে লাগবেন। ফলে বিসিএস, সরকারি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে দেশের সেরা মেধাবীরা বছরের পর বছর পড়ার ঘরে আটকা থাকবেন। তারা দেশের উৎপাদনশীল বেসরকারি বাজারে প্রবেশ করতেই চাইবেন না। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে, একটি দেশের বিশাল ও প্রাণবন্ত কর্মক্ষম শ্রমশক্তি সরাসরি উৎপাদনমুখী না হয়ে কেবলই ‘পরীক্ষামুখী’ হয়ে যাবে। দেশের বেসরকারি খাতগুলো তীব্র দক্ষ জনবল সংকটে ভুগবে, আর অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী সরকারি চাকরির আশায় বছরের পর বছর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঝুলে থাকবেন। অর্থনীতিবিদরা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দেশের প্রাইভেট বা বেসরকারি খাত যদি দক্ষ জনবল না পায় এবং গতিশীল না হয়, তবে সরকারের কাঙ্ক্ষিত ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

মূল্যস্ফীতির নিষ্ঠুর কোপ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি

নতুন এই পে স্কেলের হাত ধরে দেশের অর্থনীতিতে আরেকটি বড় বিপদ ধেয়ে আসছে, যা হলো অনিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতির চাপ। দেশের লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর হাতে হঠাৎ করে একসাথে বেশি টাকা এলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা যদি সেই আকস্মিক বাড়তি চাহিদার চাপ সামলাতে না পারে, তবে বাজারে দ্রব্যমূল্য আরও আকাশচুম্বী হবে। দেশে বর্তমানে এমনিতেই সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এমতাবস্থায়, নতুন করে দাম বাড়ার এই বাড়তি চাপ সরকারি চাকরিজীবীদের খুব একটা স্পর্শ করবে না, কারণ বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের বেতনও এক লাফে অনেক বেড়েছে। কিন্তু দেশের যে কোটি কোটি বেসরকারি কর্মী বা সাধারণ মানুষের একটি টাকাও বেতন বাড়েনি, বাজারে গিয়ে তাদের প্রতিটি পণ্যের জন্য দ্বিগুণ মূল্য চুকোত হবে। দিনশেষে এটিই হবে এই পে স্কেলের সবচেয়ে সামাজিক ও মানবিক নিষ্ঠুর পরিণাম।

প্রগতি স্কিম ও বেসরকারি সার্ভিস রুলসের ভবিষ্যৎ

অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, বেসরকারি খাতের কর্মীরা পুরোপুরি খালি হাতে থাকবেন না। দেশের সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অধীনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীদের জন্য ‘প্রগতি স্কিম’ চালু রয়েছে। এই স্কিমে একজন বেসরকারি কর্মী প্রতি মাসে ২,০০০, ৩,০০০ কিংবা ৫,০০০ টাকা চাঁদা দিলে অবসরের পর রাষ্ট্রীয় পেনশন সুবিধা পাবেন। সরকার আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অন্তত ৪ কোটি পরিবারের একজন করে সদস্যকে এই সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর পাশাপাশি, দেশের বেসরকারি খাতের বৈষম্য দূর করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একটি যুগান্তকারী ‘বেসরকারি সার্ভিস রুলস’ বা বেসরকারি চাকরি বিধিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে। এই নতুন বিধিমালায় বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতন, দৈনিক কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ও বাৎসরিক ছুটি এবং চাকরির আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা হবে।

তবে সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই বড় সংশয়—এই প্রগতি স্কিম কিংবা বেসরকারি সার্ভিস রুলস কি শেষ পর্যন্ত স্রেফ কাগজের আইনি দস্তাবেজেই আটকে থাকবে, নাকি সাধারণ মানুষের জীবনে সত্যিকারের কোনো পরিবর্তন আনবে? বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে, একজন বেসরকারি কর্মী যদি প্রতি মাসে মাত্র ১৫,০০০ টাকা বেতন পান এবং সেখান থেকে প্রগতি স্কিমের পেনশনের জন্য ৩,০০০ টাকা কেটে রাখেন, তবে তাঁর হাতে থাকবে মাত্র ১২,০০০ টাকা। বর্তমান বাজারের ভয়াবহ অবস্থায় এই সামান্য টাকা দিয়ে ঢাকা বা যেকোনো বিভাগীয় শহরে একটি সাধারণ পরিবারের ন্যূনতম ডাল-ভাতের সংসার চালানো একেবারেই অসম্ভব। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ ন্যায্য ও যৌক্তিক হলেও, রাষ্ট্র যেন দেশের সিংহভাগ অর্থনৈতিক অবদান রাখা বেসরকারি খাতের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার সুরক্ষায় সমতাভিত্তিক ও কঠোর কার্যকর পদক্ষেপ নেয়—এটাই এখন দেশের আপামর জনসাধারণের মূল দাবি।


এ জাতীয় আরো খবর...