শিরোনামঃ
যারা শাশুড়ি হতে যাচ্ছেন তাঁদের জন্য ১০টি পরামর্শ চিকিৎসার পর ফের কারাগারে দীপু মনি সংসদে ট্যাক্সের টাকায় যেন চরিত্র হনন না হয় বিরোধী দলের নির্বাচনি এলাকায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে: মির্জা ফখরুল যে কোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে: প্রধানমন্ত্রী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী গ্রাহকদের জন্যে স্মার্টফোন সাশ্রয়ী করতে বাংলালিংকের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান চাকরির জন্য তরুণদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না: প্রধানমন্ত্রী কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহারসহ কর সংস্কারের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর বন্ধ হচ্ছে আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

কক্সবাজারের বালুতে বিলিয়ন ডলারের জিরকন

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার। প্রতিদিন লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে এই সৈকত। মানুষ আসে নীল জলরাশি আর সূর্যাস্ত দেখতে। কিন্তু এই পর্যটকদের পায়ের নিচে যে বিশাল অর্থনৈতিক সম্পদ লুকিয়ে আছে, তা অনেকেরই অজানা। সমুদ্রের বালু মাড়িয়ে প্রতিদিন মানুষ হেঁটে বেড়াচ্ছে, আর সেই বালুর গভীরে প্রোথিত আছে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের মহামূল্যবান খনিজসম্পদ। এই খনিজের নাম ‘জিরকন’। শুধু জিরকন নয়, কক্সবাজার থেকে শুরু করে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১৭টি স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রুটাইল, ইলমেনাইট, গারনেট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট ও মোনাজাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভারী খনিজ। অথচ দীর্ঘ কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও এই বিশাল সম্ভাবনা আজও অবহেলিত। সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দেশের এই সম্পদ মাটির নিচেই পড়ে আছে, যা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে খনিজ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারত।

সম্ভাবনার আকর: জিরকন ও অন্যান্য খনিজ

আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে জিরকন একটি অপরিহার্য কাঁচামাল। ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার জিওলজিক্যাল সায়েন্সেস-এর মুখ্য ভূতত্ত্ববিদ ড. মোহাম্মদ রাজীবের মতে, জিরকন থেকে উৎপাদিত জিরকোনিয়াম ও এর যৌগসমূহ উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। মহাকাশ গবেষণা, জেট ইঞ্জিন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং উচ্চমানের সিরামিক তৈরিতে জিরকনের কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ববাজারে এর চাহিদাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও চীন বর্তমানে বিশ্বের প্রধান জিরকন উৎপাদনকারী দেশ। আমাদের কক্সবাজার উপকূলীয় বালুতে যে জিরকন পাওয়া যায়, তার বিশুদ্ধতা প্রায় ৯৬ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

জিরকনের পাশাপাশি কক্সবাজার উপকূলে পাওয়া ইলমেনাইট ও রুটাইল থেকে উৎপাদিত হয় টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড, যা রং, প্লাস্টিক ও কাগজসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ম্যাগনেটাইট ও গারনেট ধাতব শিল্প ও ঘর্ষণ উপকরণ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মোনাজাইট, যাতে থাকে বিরল মৃত্তিকা ও তেজস্ক্রিয় উপাদান। এগুলো উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প, শক্তিশালী চুম্বক এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই খনিজগুলোর সম্মিলিত উপস্থিতি কক্সবাজার উপকূলকে একটি কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অঞ্চলে পরিণত করেছে।

সমীক্ষায় উঠে আসা খনিজভান্ডারের বিস্তার

কক্সবাজার সৈকত খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্রের (বিএসএমইসি) গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কয়েক দশক ধরে পরিচালিত অনুসন্ধানে ১৭টি স্থানে বিরল ও ভারী খনিজভান্ডারের অস্তিত্ব মিলেছে। এর মধ্যে ১৫টি কক্সবাজার জেলায় এবং বাকি দুটি নিঝুম দ্বীপ ও কুয়াকাটায়। কক্সবাজার থেকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলজুড়ে ছয়টি পৃথক খনিজভান্ডার চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া মহেশখালীতে সাতটি, মাতারবাড়ীতে একটি ও কুতুবদিয়ায় একটি খনিজভান্ডারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) ও সংশ্লিষ্ট জরিপ তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ টন বালুর মধ্যে আনুমানিক ৪৪ লাখ টন জিরকনসহ অন্য ভারী খনিজের উপস্থিতি রয়েছে। যার মধ্যে জিরকনের পরিমাণ ১ লাখ ৫৮ হাজার টন, ইলমেনাইটের মজুত ১০ লাখ ৮ হাজার টন, রুটাইল ১ লাখ ৯১ হাজার টন, গারনেট ৩ লাখ ৫১ হাজার টন, ম্যাগনেটাইট ২ লাখ ৬৭ হাজার টন এবং মোনাজাইট প্রায় ১৭ হাজার টন। তবে দুঃখজনক সত্য হলো, এসব ভান্ডারের কোনোটিরই এখনো সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ বা সুরক্ষিতভাবে চিহ্নিতকরণ করা হয়নি। ১৯৮৬ সালের পর এ বিষয়ে আর কোনো পূর্ণাঙ্গ ডিপোজিটভিত্তিক পুনর্মূল্যায়ন হয়নি। গবেষক ড. মো. গোলাম রসুলের মতে, বর্তমান মজুতের যে হিসাব প্রচলিত আছে তা কয়েক দশকের পুরোনো। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জিরকনের প্রকৃত মজুত সরকারি হিসাবের তুলনায় বহুগুণ বেশি হতে পারে।

অবহেলার ইতিহাস ও স্থবিরতা

সম্ভাবনাময় এই খনিজসম্পদ উত্তোলনের জন্য ১৯৯৫ সালে পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার উদ্যোগে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কক্সবাজারে খনিজ বালু পৃথকীকরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পাঁচ বছর ধরে এ বিষয়ে গবেষণা ও কার্যক্রম চলে। কিন্তু পরবর্তীতে সরকার সেই পাইলট প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। সেই থেকে খনিজসম্পদের বাণিজ্যিক আহরণের বিষয়টি থমকে আছে। কেন্দ্রটির সাবেক পরিচালক ও ভূতত্ত্ববিদ ড. মো. গোলাম রসুলের মতে, বাণিজ্যিক প্রকল্প গ্রহণের বিভিন্ন প্রস্তাব ও সুপারিশ সরকারের কাছে তুলে ধরা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে হতাশাজনক হলো কক্সবাজার সৈকত খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্রের বর্তমান বেহাল দশা। ৮০ জনের জনবল কাঠামোর এই কেন্দ্রে বর্তমানে পরিচালকসহ মাত্র চারজন কর্মরত আছেন। গবেষণাগার ও ল্যাব সরঞ্জাম দীর্ঘদিনের অযত্নে প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। কেন্দ্রটির পরিচালক শেখ জাফরুল হাসানের মতে, ২০০৫ সালের পর থেকে এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম নেই। অথচ এই কেন্দ্রের ল্যাবরেটরিগুলো আধুনিকায়ন করলে এখানে খনিজ আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সংক্রান্ত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উম্মোচন করা যেত।

কেন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাণিজ্যিক আহরণ?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রের একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানান, অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশ এবং বেসরকারি কোম্পানি এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালেও কোনো সরকারই এতে সাড়া দেয়নি। এর পেছনে কাজ করছে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমন্বয়ের অভাব। খনিজ আহরণ একটি অত্যন্ত প্রযুক্তি-নির্ভর ও পরিবেশগত সংবেদনশীল কাজ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার না করলে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করে খনিজ আহরণ করা বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত একটি বিষয়। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বৈদেশিক বিনিয়োগের দিকে হাত বাড়ালে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন উৎস হতে পারে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও আগামীর করণীয়

কয়েক বিলিয়ন ডলারের খনিজসম্পদ মাটির নিচে ফেলে রাখার অর্থ হলো অর্থনৈতিক অপচয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হয়েছে এবং খনিজের বাজারদরে উল্লম্ফন ঘটেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি পরিকল্পিতভাবে খনিজ আহরণ শুরু করতে পারে, তবে তা দেশের শিল্পায়নে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। দেশীয় কোম্পানিগুলোও এখন এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছে। কিন্তু সরকারি নীতিনির্ধারণী স্তরে যে ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন, তা যেন দীর্ঘকাল ধরে অনুপস্থিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজার উপকূলের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রথমেই প্রয়োজন নতুন করে ভূতাত্ত্বিক জরিপ। কয়েক দশকের পুরোনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো বড় ধরনের বিনিয়োগ বা প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই নতুন করে ড্রিলিং এবং ডিপোজিট ভ্যালুয়েশন জরুরি। দ্বিতীয়ত, পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (EIA) করে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মাধ্যমে খনিজ পৃথকীকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে। তৃতীয়ত, এই খনিজগুলো শুধু কাঁচামাল হিসেবে রপ্তানি না করে, এগুলো থেকে চূড়ান্ত পণ্য (যেমন সিরামিক বা ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম) তৈরির শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিতে হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দেশীয় শিল্প বিকশিত হবে।

চতুর্থত, খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্রের জনবল সংকট নিরসন ও ল্যাবগুলোর আধুনিকায়ন করতে হবে। দক্ষ জনবল তৈরি না হলে শুধু যন্ত্রপাতি দিয়ে এই বিশাল কাজ চালানো অসম্ভব। ড. ওয়াজেদ মিয়ার মতো দূরদর্শী ব্যক্তিদের চিন্তা-চেতনাকে সামনে রেখে খনিজ গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পরিশেষে, খনিজসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে যেন কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ না ওঠে। অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো কীভাবে তাদের সৈকত খনিজ ব্যবস্থাপনা করছে, তা থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে।

কক্সবাজারের সৈকত আমাদের গর্বের জায়গা। পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি খনিজ শিল্প বিকশিত হলে তা পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দিতে পারে। দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে এখন সময় এসেছে দেশের এই মূল্যবান সম্পদকে কাজে লাগানোর। কোটি কোটি টাকার খনিজসম্পদ মাটির নিচে ফেলে রেখে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল থাকা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। তাই এখনই সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং পরিকল্পিতভাবে এই খনিজভান্ডার ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চার করার। বাংলাদেশের উপকূলের এই বিশাল সম্ভাবনাকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবেই আমরা আগামীর উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাব।

 

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...