আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নাগরিক রূপান্তরের অন্যতম অদৃশ্য চালিকাশক্তি হলো বেতার তরঙ্গ বা ‘স্পেকট্রাম’। ভয়েস কল থেকে শুরু করে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট—ডিজিটাল সব ধরনের যোগাযোগের মূল অক্সিজেন এই অদৃশ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে তরঙ্গকে কেবল সরকারি কোষাগারের তাৎক্ষণিক রাজস্ব আয়ের একটি সহজ মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই রাজস্বকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ফলে তরঙ্গের কৃত্রিম উচ্চমূল্য এবং লাইসেন্সিংয়ের কঠোর শর্তাবলি টেলিকম খাতকে ক্রমাগত আর্থিক চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল সংলাপে খাতসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিবিদ, গবেষক এবং শীর্ষ অপারেটরদের নির্বাহীরা একযোগে এই পুরোনো মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁদের সুস্পষ্ট বার্তা—তরঙ্গকে স্রেফ রাজস্ব আহরণের পণ্য না বানিয়ে একে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
এই আলোচনার সময়টি দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সংবেদনশীল। চলতি বছরের শেষভাগে দেশের মোবাইল অপারেটরদের ব্যবহৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ব্যান্ড—৯০০ মেগাহার্টজ, ১৮০০ মেগাহার্টজ এবং ২১০০ মেগাহার্টজের ১৮ বছর মেয়াদি লাইসেন্স নবায়নের নির্ধারিত সময় এসে উপস্থিত হয়েছে। ২০০৮ সালে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যখন এই তরঙ্গগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তখন প্রধান অগ্রাধিকার ছিল সরকারের কোষাগার সমৃদ্ধ করা। কিন্তু বিগত দেড় দশকে প্রযুক্তি খাতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, তার সাথে সেই পুরোনো ফি ও করকাঠামো আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আঞ্চলিক ও সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে তরঙ্গের মূল্য এখনো অনেক বেশি। চড়া মূল্যে তরঙ্গ কেনার পর অপারেটরদের মূলধনি তহবিলে টান পড়ে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, নতুন টাওয়ার স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে কলড্রপ এবং ধীরগতির ইন্টারনেটের মতো সেবার মানের দুর্বলতাগুলো স্থায়ী রূপ নেয়।
নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকেও এবার কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের আভাস মিলছে। প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ সংলাপে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, তরঙ্গ নবায়নের ক্ষেত্রে অতীতের মতো কোনো একপেশে বা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। বর্তমান বাস্তবতায় গ্রাহকের প্রকৃত প্রয়োজন, ভবিষ্যৎ ডিজিটাল অর্থনীতির ব্যবসায়িক রূপরেখা এবং অপারেটরদের সেবা সক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করেই নীতি প্রণয়ন করা হবে। অন্যদিকে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) শীর্ষ পর্যায় থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত কোনো অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও গভীর বৈজ্ঞানিক-অর্থনৈতিক গবেষণার ওপর দাঁড়িয়ে নেওয়া হবে।
মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন এমটব এবং শীর্ষস্থানীয় অপারেটরদের প্রধানদের বিশ্লেষণে খাতের ভেতরের গভীর আর্থিক সংকটটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অপারেটরদের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয় যে, বিগত পাঁচ বছরে জাতীয় কোষাগারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে তাঁদের অবদান বহুগুণ বাড়লেও, বিপুল মূলধনি বিনিয়োগের বিপরীতে অর্জিত মুনাফা বা রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। উচ্চমূল্যের তরঙ্গ কেনার বাধ্যবাধকতা থাকলে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি বা প্রান্তিক পর্যায়ে নেটওয়ার্ক বিস্তারে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে বাধ্য। বিশ্বের সফল ডিজিটাল অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, সাশ্রয়ী ও যুক্তিসঙ্গত মূল্যে পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হলে অপারেটররা সেই অর্থ নেটওয়ার্কের গুণগত মান বাড়াতে পুনঃবিনিয়োগ করে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, তরঙ্গের প্রকৃত মূল্য কেবল নিলামের টাকায় পরিমাপ করা যায় না। এর মাধ্যমে সমাজে যে ডিজিটাল সংযোগ গড়ে ওঠে, ই-কমার্স, ফিনটেক, ফ্রিল্যান্সিং, স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা এবং শিল্প উৎপাদনে যে গতি সঞ্চারিত হয়—তার সামগ্রিক আর্থিক মূল্য রাজস্ব প্রাপ্তির চেয়েও অনেক বেশি। তাই আসন্ন লাইসেন্স নবায়নের মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে সরকারকে রাজস্বের মোহ ত্যাগ করে একটি বিনিয়োগবান্ধব, আধুনিক ও টেকসই তরঙ্গ নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। তবেই কেবল ডিজিটাল বৈষম্য দূর করে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ইন্টারনেটের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।