বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:১১ পূর্বাহ্ন

ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দ্বৈরথ: পরিসংখ্যানে কার জয় বেশি?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬

ফুটবল দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ লড়াইয়ের নাম নিলেই সবার আগে যে দুটি দেশের নাম মাথায় আসে, তা হলো আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল। লাতিন আমেরিকার এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের লড়াই কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, এটি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। আবেগ, উত্তেজনা, উন্মাদনা এবং শত বছরের পুরোনো এক দ্বৈরথের মিশেল এই ‘সুপারক্লাসিকো’। এবারের ফুটবল বিশ্বকাপেও এই দুই পরাশক্তিকে ঘিরে ভক্তদের প্রত্যাশার পারদ আকাশ ছুঁয়েছে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যেমন দুর্দান্ত ছন্দে থেকে মাঠ কাঁপাচ্ছে, তেমনি নিজেদের প্রথম ম্যাচে কিছুটা আশানুরূপ পারফর্ম করতে না পারলেও ক্রমেই নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।

সবকিছু যদি ঠিকঠাক থাকে এবং দুই দলই যদি তাদের নিজেদের জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে পারে, তবে এবারের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দেখা হয়ে যেতে পারে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর। আর এই সম্ভাব্য মহারণকে কেন্দ্র করেই সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলভক্তের মনে উঁকি দিচ্ছে অতীত পরিসংখ্যানের নানা হিসাব-নিকাশ।

বিশ্বকাপের সুবিশাল ও গৌরবময় ইতিহাসে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল ঠিক কতবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে? সেই লড়াইগুলোতে জয়ের পাল্লা কার দিকে ভারী? কিংবা সর্বশেষ কবে বিশ্বমঞ্চে এই দুই দলের দেখা হয়েছিল? এমন অসংখ্য প্রশ্ন এখন ফুটবল অনুরাগী থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শকদের মনে। চলুন, পরিসংখ্যান এবং অতীতের পাতা উল্টে দেখে নেওয়া যাক বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইয়ের আদ্যোপান্ত।

বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যান

অনেকেই হয়তো ভেবে থাকেন, যেহেতু দুই দলই বিশ্বকাপের নিয়মিত এবং শক্তিশালী প্রতিযোগী, তাই হয়তো তারা বহুবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। প্রায় এক শতাব্দীর বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল একে অপরের বিপক্ষে মাঠে নেমেছে মাত্র চারবার

এই চারবারের দেখায় পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, জয়ের পাল্লাটা সেলেসাও অর্থাৎ ব্রাজিলের দিকেই বেশি হেলে আছে। চারবারের লড়াইয়ে ব্রাজিল জয়লাভ করেছে মোট দুবার। অন্যদিকে, আলবিসেলেস্তে বা আর্জেন্টিনার জয় মাত্র একটিতে। বাকি একটি ম্যাচ অমীমাংসিতভাবে ড্র হয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই দলের সর্বশেষ দেখায় জয়ের শেষ হাসিটা হেসেছিল আর্জেন্টিনাই।

নিচে প্রতিটি লড়াইয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলো:

১. প্রথম লড়াই: ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপ

ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই পরাশক্তির প্রথম দেখা মেলে ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে। তখন ফুটবল বিশ্বে ব্রাজিলের সুবর্ণ যুগ চলছে, অন্যদিকে আর্জেন্টিনাও নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর আলবিসেলেস্তেদের ২-১ গোল ব্যবধানে পরাজিত করেছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।

ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। ৩২তম মিনিটে রিভেলিনোর করা দুর্দান্ত এক গোলে প্রথমে এগিয়ে যায় সেলেসাওরা। তবে সেই লিড খুব বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি তারা। মাত্র তিন মিনিট পরেই, অর্থাৎ ৩৫তম মিনিটে মিগুয়েল ব্রিনদিসির দুর্দান্ত এক গোলে সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধ ১-১ সমতায় শেষ হলেও, দ্বিতীয়ার্ধের ৪৯তম মিনিটে জাইরজিনহোর করা অসাধারণ একটি গোলে আবারও এগিয়ে যায় ব্রাজিল। এরপর আর্জেন্টিনা অনেক চেষ্টা করেও আর গোল শোধ করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত নিজেদের লিড শক্তভাবে ধরে রেখে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথম জয় নিশ্চিত করে ব্রাজিল।

২. দ্বিতীয় লড়াই: ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ

ঠিক চার বছর পর, ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে আবারও একে অপরের মুখোমুখি হয় লাতিন আমেরিকার এই দুই ফুটবল জায়ান্ট। এবারের বিশ্বকাপের আসর বসেছিল আর্জেন্টিনার মাটিতে। ঘরের মাঠে খেলা হওয়ায় আর্জেন্টিনার ওপর প্রত্যাশার চাপ ছিল অনেক বেশি। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় রাউন্ডে একই গ্রুপে পড়েছিল দুই দল।

১৮ জুন অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটিকে ঘিরে দর্শকদের মাঝে চরম উত্তেজনা বিরাজ করলেও, মাঠের খেলায় কোনো দলই জালের দেখা পায়নি। আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণে ম্যাচটি জমে উঠলেও দুই দলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি গোলশূন্য (০-০) ড্রতেই মীমাংসিত হয়। তবে এই ড্রয়ের পরও টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত গিয়ে শিরোপা জিতেছিল স্বাগতিক আর্জেন্টিনাই।

৩. তৃতীয় লড়াই: ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপ

১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের মহারণে মুখোমুখি হয় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। সেবার ব্রাজিল দলে ছিলেন সক্রেটিস, জিকোদের মতো কিংবদন্তিরা, যারা বিশ্বফুটবলে ‘জোগো বোনিতো’ বা সুন্দর ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা দলে ছিলেন উদীয়মান তারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনা।

কিন্তু সেই ম্যাচে সেলেসাওদের নান্দনিক ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের কাছে আক্ষরিক অর্থেই খড়কুটোর মতো উড়ে যায় তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচে আর্জেন্টিনা সেভাবে পাত্তাই পায়নি। ব্রাজিল সেই ম্যাচে ৩-১ গোলের বড় ব্যবধানে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেয়।

৪. চতুর্থ ও শেষ লড়াই: ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপ

ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে চতুর্থ এবং এখন পর্যন্ত শেষবারের মতো একে অপরের বিপক্ষে মাঠে নামে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল। এটি ছিল টুর্নামেন্টের নকআউট পর্ব বা রাউন্ড অফ সিক্সটিনের ম্যাচ। আগের তিন দেখায় কোনো জয় না পাওয়ার আক্ষেপ এবং বিশেষ করে ১৯৮২ সালের বড় হারের প্রতিশোধ নেওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেদিন মাঠে নেমেছিল আলবিসেলেস্তেরা।

পুরো ম্যাচজুড়েই ব্রাজিল দাপটের সঙ্গে খেলে এবং একাধিকবার গোল করার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু ফুটবলের বিধাতা সেদিন অন্য কিছু লিখে রেখেছিলেন। ম্যাচের শেষভাগে এসে ডিয়েগো ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্য এবং মাঝমাঠ থেকে নেওয়া এক জাদুকরী পাসের সুবাদে বল পান ক্লদিও কানিগিয়া। ব্রাজিলের গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়ান তিনি। সেই ১-০ গোলের জয় দিয়ে ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেয় আর্জেন্টিনা। সেবারের বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত রানারআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল আলবিসেলেস্তেরা।

অপেক্ষার অবসান কি এবার হবে?

১৯৯০ সালের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের পর বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে আর কখনোই দেখা হয়নি এই দুই দলের। মাঝখানে কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৬টি বছর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফুটবলভক্তরা অপেক্ষা করে আছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে আরও একটি ‘সুপারক্লাসিকো’ দেখার জন্য।

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এই দুই দল কি দীর্ঘ ৩৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মুখোমুখি হবে? গ্যালারিতে কি আবারও দেখা যাবে হলুদ এবং আকাশি-সাদার সেই চিরচেনা বিভাজন? ফুটবল বিশ্ব এবং কোটি কোটি ভক্তের এই দীর্ঘ লালিত প্রত্যাশা এবার সত্যিই বাস্তবে পরিণত হবে কি না, তা কেবল সময়ই বলে দেবে। তবে যদি সত্যিই তারা মুখোমুখি হয়, তবে সেটি যে ফুটবল ইতিহাসের আরও একটি স্মরণীয় এবং মহাকাব্যিক লড়াই হতে যাচ্ছে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।


এ জাতীয় আরো খবর...