শিরোনামঃ
বাড়ি ভাড়া নেওয়ার আগে: ১০টি পরামর্শ ডাকলেই কাছে চলে আসবে টয়লেট! মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী রাজনীতিবিদদের ভুল তুলে ধরা সাংবাদিকদের দায়িত্ব: মির্জা ফখরুল খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন বিদেশি অতিথি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা তেহরানে গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন এলপিজির দাম কমেছে, ধাপে ধাপে জ্বালানি তেলও কমানো হবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফুটবল দর্শনে দেশীয় ফুটবলের রূপান্তর পরিকল্পনা সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী অপহরণ মামলায় সাবেক এএসপি গ্রেপ্তার তেহরানে খামেনির জানাজায় রেকর্ড জনসমাগমের আশা
শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

রেকর্ড গরমেও ইউরোপের এসি না থাকার কারণ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত এবং প্রযুক্তিনির্ভর মহাদেশগুলোর অন্যতম ইউরোপ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের এক চরম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি। যে মহাদেশটি ঐতিহাসিকভাবে তার মনোরম ও শীতল আবহাওয়ার জন্য সুপরিচিত ছিল, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে তা এখন রীতিমতো তপ্ত চুল্লিতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থার্মোমিটারের পারদ অবিশ্বাস্যভাবে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বৈরী কাঁটা স্পর্শ করেছে। এই রেকর্ড ভাঙা তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে স্বাভাবিক জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বহু স্কুল-কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চার দেয়ালের বন্ধ খাঁচায় তীব্র গরমে ছটফট করছে লাখো মানুষ, এবং মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি নাগরিক। কিন্তু এই চরম মানবিক সংকটের মাঝেও বিশ্ববাসীকে সবচেয়ে বেশি অবাক করছে একটি অদ্ভুত দৃশ্য—প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে এবং অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপের সিংহভাগ মানুষ কেন এখনও এসি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ছাড়াই এই নারকীয় যন্ত্রণা সহ্য করছেন? যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০ শতাংশ বাসাবাড়িতে এসির উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে ইউরোপ মহাদেশে এই হার মাত্র ২০ শতাংশ। বিলাসী ও আধুনিক ইউরোপীয়দের এই এসি-অনিহার পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু গভীর ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক এবং কঠোর আইনি কারণ।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউরোপে কোনোকালেই এসির প্রথাগত চল বা সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এর সবচেয়ে সরল কারণটি হলো, সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত সেখানে গ্রীষ্মকালে এসি ব্যবহার করার মতো কোনো প্রয়োজনীয়তাই ছিল না। বছরের অধিকাংশ সময়ই এখানকার আবহাওয়া ঠান্ডা ও আরামদায়ক থাকত, যার ফলে এসি নামক প্রযুক্তিটি ইউরোপীয় মানসিকতায় কখনও আবশ্যিক পণ্যের তালিকায় স্থান পায়নি। তারা এখনও এসিকে জীবনের একটি মৌলিক চাহিদার চেয়ে বরং অতিরিক্ত বিলাসিতা হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত। বর্তমানে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের চরম থাবায় অনেক আগেভাগেই তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ শুরু হচ্ছে, তখনও সিংহভাগ ইউরোপীয় নাগরিক স্বস্তির জন্য কোনো যান্ত্রিক প্রযুক্তির দিকে না ঝুঁকে প্রথাগত ও প্রাচীন কিছু পদ্ধতির ওপরই ভরসা রাখছেন। ঘরের কোণে একটি সামান্য বৈদ্যুতিক পাখা চালানো, বরফ ব্যবহার করা কিংবা ঠান্ডা পানিতে বারবার গোসল করার মাধ্যমেই তারা এই অসহ্য গরমকে মোকাবিলা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় কারণটি সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে টান দেয়, যা মূলত খাঁটি অর্থনৈতিক সংকট। ইউরোপের বাজারগুলোতে একটি এসি কেনা এবং পরবর্তীতে তা নিয়মিত চালানো—দুটোই অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও বিলাসী ব্যাপার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও জ্বালানি নীতির তুলনায় ইউরোপের দেশগুলোতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম আকাশচুম্বী। অথচ সেই চড়া বিদ্যুৎ বিলের বিপরীতে গড় সাধারণ মানুষের মাসিক আয় বা লভ্যাংশের অনুপাত ততটা বেশি নয়। এর ফলে গ্রীষ্মের কয়েকটা দিন ঘর ঠান্ডা রাখার জন্য এসি চালিয়ে মাস শেষে যে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুতের বিল আসবে, তা মেটানো মধ্যবিত্ত ও সাধারণ ইউরোপীয়দের সাধ্যের বাইরে। অর্থনৈতিক এই বিশাল খরচের ভয়েই মূলত লাখ লাখ পরিবার তীব্র কষ্ট সহ্য করলেও ঘরে এসি ডাকার কথা চিন্তাও করতে পারেন না।

অর্থনীতির পাশাপাশি ইউরোপের প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী এবং শতাব্দী প্রাচীন বাড়িগুলোর অভ্যন্তরীণ গঠনও এসি না থাকার পেছনে বড় কাঠামোগত বাধা হিসেবে কাজ করছে। দক্ষিণ ইউরোপের যে অংশগুলোতে গরম কিছুটা বেশি, সেখানকার পুরনো ভবনগুলোর দেয়াল অত্যন্ত পুরু এবং জানালাগুলো আকারে বেশ ছোট। ঐতিহ্যগতভাবেই এই বিশেষ নির্মাণশৈলী বাইরের রোদ ও উত্তাপকে আটকে রেখে ঘরের ভেতরটা প্রাকৃতিকভাবেই ঠান্ডা রাখত। কিন্তু বাকি ইউরোপের, বিশেষ করে উত্তর ও মধ্য অঞ্চলের বাড়িগুলো তৈরি হয়েছিল কেবল প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে বাঁচার কথা মাথায় রেখে, গরমের কথা ভেবে নয়। উদাহরণস্বরূপ, ইংল্যান্ডের প্রতি ছয়টি আবাসিক বাড়ির মধ্যে অন্তত একটি বাড়ি ১৯০০ সালের আগে, অর্থাৎ আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে নির্মিত হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক ও প্রাচীন বাড়িগুলোতে আধুনিক সেন্ট্রাল এসি বা স্প্লিট এসি বসানোর মতো কোনো প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত সুযোগ নেই। দেয়াল কেটে বা পাইপলাইনের জন্য ড্রিল করে প্রাচীন এই ভবনগুলোর ক্ষতি করা প্রযুক্তিগতভাবেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন।

এই কাঠামোগত সমস্যার ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে চেপে বসেছে ইউরোপের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কঠোর ঐতিহ্য সংরক্ষণ আইন। ইউরোপের দেশগুলো তাদের প্রাচীন ইতিহাস ও শহরের নান্দনিক সৌন্দর্য রক্ষায় অত্যন্ত কড়া নিয়ম মেনে চলে। এয়ার কন্ডিশনিং শিল্পের শীর্ষ পরিচালকদের মতে, ইউরোপের যেকোনো ঐতিহ্যবাহী এলাকা বা সংরক্ষিত ঐতিহাসিক ভবনের বাইরের দেয়ালে এসির আউটডোর ইউনিট বসানোর ক্ষেত্রে কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, ভবনের গায়ে বা বারান্দায় এসির এই যান্ত্রিক বাক্সগুলো ঝোলালে পুরো শহরের প্রাচীন স্থাপত্যের সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক অবয়ব সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। এই নান্দনিকতার অজুহাতে স্থানীয় নগর কর্তৃপক্ষ ও হেরিটেজ কাউন্সিলগুলো সাধারণ নাগরিকদের এসি বসানোর আবেদন বছরের পর বছর ধরে প্রত্যাখ্যান করে আসছে, যার ফলে আইনি গ্যাঁড়াকলে আটকে সাধারণ মানুষ গরমেই দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

তবে প্রকৃতি হয়তো আর বেশিদিন ইউরোপকে তার এই পুরোনো ঐতিহ্য বা রক্ষণশীল মনোভাব ধরে রাখার সুযোগ দেবে না। বৈজ্ঞানিক তথ্য ও আবহাওয়া উপাত্ত অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দ্রুতগতিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ইউরোপ মহাদেশ। প্রতি বছর যেভাবে তাপপ্রবাহের নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে, তাতে এসির প্রতি ইউরোপীয়দের এই দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল দেয়াল ও অনিহা এখন ধাপে ধাপে ভাঙতে শুরু করেছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদেই মানুষ এখন পুরোনো সংস্কার ভুলে এসির দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে গত মাত্র পাঁচ বছরে ইউরোপের বাজারগুলোতে বাসাবাড়ির এসির চাহিদা এক ধাক্কায় তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, জলবায়ুর এই চরম বিপর্যয় যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে সচল এসির সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে প্রায় ২৭৫ মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে। এই সংখ্যাটি ২০১৯ সালের মোট এসির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে বোঝা যাচ্ছে, একসময়ের শীতল ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী ও এসিহীন দিনগুলো এখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং প্রকৃতির রুদ্ররূপের কাছে শেষ পর্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিকেই আপন করে নিতে হচ্ছে সম্পদশালী ইউরোপীয়দের।


এ জাতীয় আরো খবর...