শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ন

বিবাহবিচ্ছেদে পুতুলের গোপন চুক্তি

জুলকারনাইন সায়ের / ১৯ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা এবং আন্তর্জাতিক অটিজম আন্দোলনের পরিচিত মুখ সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের দীর্ঘ ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটেছে। সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে খন্দকার মাশরুর হোসেনের সঙ্গে তার এই দীর্ঘ বৈবাহিক সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে ২০২১ সালে, যা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্পূর্ণ গোপনে রাখা হয়েছিল। এই হাই-প্রোফাইল বিবাহ বিচ্ছেদের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কিংবা নথিপত্র কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আদালতের ফ্যামিলি গাইডেন্স অ্যান্ড রিফর্মেশন বিভাগের একটি চুক্তিনামা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পত্তি সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড থেকে এই বিচ্ছেদের চূড়ান্ত দেনমোহর ও শর্তাবলীর চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, বিচ্ছেদের চুক্তি হিসেবে পুতুল নগদ অর্থ এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি লাভ করেছেন।

দুবাই আদালতের বিবাহ বিচ্ছেদের সেই চুক্তি অনুসারে, বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার খেসারত হিসেবে খন্দকার মাশরুর হোসেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে নগদ আড়াই লাখ মার্কিন ডলার বা ২৫০,০০০ ডলার দিতে বাধ্য হন, যা বর্তমান বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন কোটি টাকারও বেশি। এই মোটা অঙ্কের নগদ অর্থের পাশাপাশি পুতুলকে স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত দুটি বিলাসবহুল বাড়ি সম্পূর্ণ হস্তান্তর করা হয়েছে। ফ্লোরিডার এই দুটি বাড়ির বর্তমান সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকার কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক আইন ও আদালতের চুক্তি অনুযায়ী, যৌথ মালিকানায় থাকা এই সম্পত্তি দুটি ফ্লোরিডায় নিবন্ধিত ‘নেভা ইনকরপোরেটেড’ নামের একটি লাভজনক সংস্থার অধীনে হস্তান্তর করা হয়। আর এই করপোরেট সংস্থার একমাত্র আইনি মালিক এবং সম্পূর্ণ সুবিধাভোগী হলেন স্বয়ং সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।

আদালতের নথি থেকে এই হস্তান্তরকৃত মার্কিন সম্পত্তিগুলোর বিশদ বিবরণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রথম সম্পত্তিটি সেন্ট জনস কাউন্টির ফ্রুট কোভের ‘৪৫৬ বে পয়েন্ট ওয়ে’তে অবস্থিত, যা ২০০৫ সালের ১ নভেম্বর এই দম্পতি যৌথ নামে ২ লাখ ৪৫ হাজার ডলারে ক্রয় করেছিলেন। বর্তমানে এই বাড়িটির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪০ ডলারে। দ্বিতীয় বাড়িটি মেইটল্যান্ডের ‘৮৪৫ ইয়র্ক ওয়ে’তে অবস্থিত। চার শয়নকক্ষ এবং দুই বাথরুমবিশিষ্ট এই একতলা বাড়িটির বর্তমান বাজারদর প্রায় ৪ লাখ ৮৪ হাজার থেকে ৫ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। নগদ টাকা ও রিয়েল এস্টেট সম্পত্তি মিলিয়ে প্রায় ১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকার সমপরিমাণ সম্পদ হস্তান্তরের পাশাপাশি পুতুলের বিয়েতে পাওয়া সমস্ত উপহার, ব্যক্তিগত আসবাবপত্র, পোশাক, অলঙ্কার এবং যাবতীয় স্মারকচিহ্নও সাবেক স্বামী ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন। পুতুলের নির্দেশিত স্থানেই এসব মালামাল পৌঁছে দেওয়ার শর্ত চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং খন্দকার মাশরুর হোসেনের সংসারে মোট চার সন্তান রয়েছে। বিচ্ছেদের চুক্তিতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও জিম্মাদারির বিষয়েও সুনির্দিষ্ট আইনি রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়। চুক্তি সম্পাদনের সময় সন্তানদের মধ্যে যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল, আইনিভাবে তাদের অভিভাবক বা গার্ডিয়ান হিসেবে খন্দকার মাশরুর হোসেনের নাম থাকলেও, তাদের মূল কাস্টডি বা জিম্মাদারি অর্পণ করা হয়েছে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ওপর। এছাড়া সন্তানরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই পড়াশোনা করতে চাক না কেন, তাদের উচ্চশিক্ষা, দীক্ষা এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের যাবতীয় ব্যয়ভার এককভাবে খন্দকার মাশরুর হোসেনকে বহন করতে হবে বলে আদালতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে এতো বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পত্তি হস্তান্তরের পর মাশরুরের কাছে আর কী পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট রয়েছে বা বিদেশে তার আয়ের উৎস কী ছিল, তা জানা যায়নি।

পুতুল ও মাশরুরের এই পারিবারিক বিচ্ছেদের প্রভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এক বড় ধরনের পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। ১৯৯৫ সালে যখন তাদের বিয়ে হয়, তখন শেখ হাসিনা ছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী। মাশরুরের বাবা ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন তখন মাঝারি সারির সাবেক আমলা ছিলেন, যিনি মূলত এই বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্র ধরেই শেখ হাসিনার বেয়াই হিসেবে সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পর খন্দকার মোশাররফের রাজনৈতিক ভাগ্য খুলে যায় এবং তিনি প্রথমে প্রবাসী কল্যাণ এবং পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত দাপুটে ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। শেখ হাসিনার বেয়াই হিসেবে তৎকালীন সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন তিনি।

তবে ২০১৯ সাল থেকে এই প্রভাবশালী মন্ত্রীর সংসারে ফাটল ধরতে শুরু করে এবং সমান্তরালভাবে দেশের রাজনীতিতেও খন্দকার মোশাররফের পতন ত্বরান্বিত হয়। ২০১৯ সালের নতুন মন্ত্রিসভায় তাকে আর জায়গা দেওয়া হয়নি, যদিও সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করা হয়েছিল। ২০২০ সালের দিকে পুতুল ও মাশরুরের দাম্পত্য সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটলে মোশাররফকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলী এবং ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের পদ থেকে একযোগে বহিষ্কার করা হয়। একই সাথে ফরিদপুরে তার অনুসারী ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শুরু হয় তীব্র দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। ২০২১ সালে দুবাই আদালতে পুতুল-মাশরুরের অফিশিয়াল ডিভোর্সের পর খন্দকার মোশাররফের ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবরসহ তার ঘনিষ্ঠদের একের পর এক টেন্ডারবাজি ও দখলের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে সংসদীয় কমিটির পদ হারিয়ে দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমান ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে শেখ হাসিনার প্রভাবে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে ভারতের দিল্লিতে এক হাই-প্রোফাইল চাকরি বাগিয়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুতুলের এই চাকরিতেও ধাক্কা লাগে। বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তীব্র আপত্তির মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাধ্যতামূলক ‘ছুটি’ প্রদান করেছে। বর্তমানে পুতুল তার কানাডিয়ান পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুবাইয়ে অবস্থানরত সন্তানদের কাছে এবং ভারতের দিল্লিতে চিকিৎসাধীন মায়ের কাছে যাতায়াত করছেন বলে জানা গেছে। দীর্ঘ ২৫ বছরের এই বৈবাহিক সম্পর্কের করুণ অবসান কেবল একটি পরিবারের ভাঙন নয়, বরং বাংলাদেশের একটি চরম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আধিপত্যের পতনকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।

তথ্যসূত্র: জুলকারনাইন সায়ের, টাইমস অব বাংলাদেশ


এ জাতীয় আরো খবর...