বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৩০ পূর্বাহ্ন

এমবাপেকে ছায়ায় ঢেকে নায়ক বনে গেলেন ইয়ামাল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

মাঠের লড়াই শুরুর আগে ফুটবল অনুরাগীদের মনে একটা বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল—বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দামি, ৩৭ হাজার কোটি টাকার এই হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালে কার জাদু শেষ পর্যন্ত হাসবে? ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে নাকি স্পেনের নতুন সূর্য লামিন ইয়ামাল? অবশেষে মাঠের উত্তেজনায় ঠাসা ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে উত্তর মিলেছে। ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সেমিফাইনালের মঞ্চ কাঁপিয়ে, ফ্রান্সের রক্ষণব্যূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে স্পেনকে ফাইনালে তোলার মূল কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সেই ১৭ বছরের তরুণ মহাতারকা লামিন ইয়ামাল। ফ্রান্সের উইঙ্গার ও স্ট্রাইকারদের ৮৭৭ মিলিয়ন ডলারের বিশ্বসেরা আক্রমণভাগ এবং শক্তিশালী ডিফেন্স লাইনকে একা হাতে পরাস্ত করে বিশ্ব ফুটবলে নিজের এক নতুন কীর্তিগাথা রচনা করলেন স্প্যানিশ উইঙ্গার।

স্পেনের এই ঐতিহাসিক জয়ের রাতে মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে অনন্য এক আলো ছড়ালেন লামিন ইয়ামাল। ম্যাচের শুরুটা অবশ্য স্পেনের জন্য খুব একটা সুখকর ছিল না। প্রথমার্ধের শুরুর দিকেই ফরাসিদের আক্রমণের ধার ও কৌশলী মুভের কাছে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল স্প্যানিশ রক্ষণভাগ। কিন্তু ঠিক যখন মনে হচ্ছিল স্পেনের ৪৯১ মিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী মাঝমাঠকে বোতলবন্দী করে কিলিয়ান এমবাপেরা ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছেন, তখনই দৃশ্যপটে হাজির হন স্প্যানিশ এই বিস্ময় বালক। মাঠের ডান প্রান্ত ধরে ফরাসি ডিফেন্ডারদের চোখের পলকে ড্রিবলিংয়ের ফাঁদে ফেলে, ডি-বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর এক দূরপাল্লার নিখুঁত ও বাঁকানো শট যখন ফরাসি গোলরক্ষককে পরাস্ত করে জালে জড়ায়, তখন গ্যালারির হাজার হাজার সমর্থক এক অবিশ্বাস্য মুহূর্তের সাক্ষী হন। এই জাদুকরী গোলটি কেবল স্পেনকে ম্যাচেই ফেরায়নি, বরং পুরো দলের আত্মবিশ্বাসকে এক ধাক্কায় চূড়ায় নিয়ে যায়।

খাত সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেমিফাইনালের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে ইয়ামালের পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে কেন আন্তর্জাতিক বাজারে তাঁর বর্তমান মূল্য প্রায় ২৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং কেন তাঁকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফরাসিদের বিশ্ববিখ্যাত ও অত্যন্ত সুসংগঠিত ডিফেন্স লাইন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার, তাকে এই তরুণ একা হাতে যে পরিমাণ ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিলেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে উইংগুলোতে তাঁর ক্ষিপ্র গতি, বলের ওপর অতিমানবীয় নিয়ন্ত্রণ এবং সতীর্থদের দিয়ে আক্রমণ তৈরি করার দূরদর্শিতা পুরো ফরাসি রক্ষণভাগকে দিশাহীন করে দিয়েছিল। কিলিয়ান এমবাপের মতো বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ডের উপস্থিতিতেও পুরো আলো কেড়ে নেন এই স্প্যানিশ উইঙ্গার।

পজিশন ভিত্তিক বাজারমূল্যের যে বিশাল ব্যবধান ছিল, মাঠের খেলায় তা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন ইয়ামাল ও তাঁর দল। ফরাসিদের শক্তিশালী আক্রমণভাগের গভীরতা ও ৮৭৭ মিলিয়ন ডলারের অহংকারকে স্প্যানিশ মাঝমাঠের নিরেট দেয়ালে আটকে দিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন এই তরুণ। ম্যাচের প্রথমার্ধে স্পেনের দ্বিতীয় গোলটির ক্ষেত্রেও তাঁর পরোক্ষ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর অবদান ছিল, যা ফরাসিদের ম্যাচ থেকে ছিটকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত সময়ের চরম শারীরিক ধকলের মাঝেও মাঠের ডান প্রান্তে যেভাবে তিনি ফরাসি রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের গতিতে পরাস্ত করছিলেন, তা স্পেনের কোচ মুরাত ইয়াকিন ও ফুটবলারদের মুগ্ধ করেছে। মেসির সেই পুরোনো চেনা বার্সেলোনা একাডেমির ছোঁয়া যেন এই তরুণের পায়ে আবারও বিশ্বমঞ্চ দেখল।

ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের ওপর এই ঐতিহাসিক ও কষ্টার্জিত জয় উদযাপন করতে গিয়ে স্পেনের প্রধান তারকা লামিন ইয়ামাল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “এই দিনটি আমাদের পুরো দলের জন্য এবং আমার জীবনের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ফ্রান্সের মতো এত শক্তিশালী এবং বিশ্বমানের ডিফেন্স লাইনের বিরুদ্ধে গোল করা এবং দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে যাওয়াটা স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। আমরা জানতাম ম্যাচটি কতটা কঠিন হবে, কিন্তু মাঠে আমরা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম।” অন্যদিকে ফরাসি শিবিরের পরাজয় মেনে নিয়ে ফুটবল বোদ্ধারাও স্বীকার করেছেন যে, ইয়ামালের এই অদম্য ও অপ্রতিরোধ্য গতিই আজ দুই দলের মধ্যে প্রধান তফাৎ গড়ে দিয়েছে, যা ফরাসিদের স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করেছে।

শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে এত কম বয়সে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালের মতো মহাচাপের ম্যাচে এমন ঠান্ডা মাথার নেতৃত্বসুলভ পারফরম্যান্স ফুটবল ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে। এই অবিশ্বাস্য জয়ের ফলে স্পেন যেমন নিজেদের চতুর্থ শিরোপা জয়ের মিশন ও সোনালী ট্রফির দিকে আরও এক ধাপ দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে গেল, তেমনই বিশ্ব ফুটবল ডায়েরিতে স্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে গেল লামিন ইয়ামালের নাম। ফাইনালের মহারণে নামার আগে এই ফর্মে থাকা তরুণ তুর্কিই এখন স্পেনের প্রধান অস্ত্র এবং প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

 


এ জাতীয় আরো খবর...