বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন

ঝুঁকিপূর্ণ বিমান চলাচল: বিমানবন্দরের আশপাশে পাঁচশ উঁচু ভবন

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্লেন আছড়ে পড়ে ৩৫ জন প্রাণ হারানোর নির্মম ঘটনার পর ঢাকার আকাশপথে বিমান চলাচলের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরের অতি নিকটবর্তী এলাকায় নির্ধারিত উচ্চতাসীমা লঙ্ঘন করে গড়ে তোলা অন্তত ৫২৫টি অতি-ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন শনাক্ত করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। আন্তর্জাতিক আইকাও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে, এমন কি জালিয়াতির মাধ্যমে বেবিচকের ভুয়া অনাপত্তিপত্র ব্যবহার করে গত এক দশকে এসব ইমারত গড়ে তোলা হয়েছে। এসব অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো অবিলম্বে ভেঙে ফেলার জন্য রাজউককে এক বছর পূর্বে প্রাতিষ্ঠানিক তাগিদ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এর ফলে ঢাকা শহরের ওপর দিয়ে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় যেকোনো মুহূর্তে আবারও বড় ধরনের বিমান দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

গত বছরের ২১ জুলাই উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুলে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে ৩৫ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানির পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে আহত হন আরও অন্তত ৬৫ জন ছাত্র-শিক্ষক ও পথচারী। পরবর্তীতে ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে যে, বিমানটির যান্ত্রিক গোলযোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড বা বিএনবিসি অমান্য করে রানওয়ের কাছে অপরিকল্পিতভাবে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের কারণে হতাহতের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বরা বলছেন যে, এই ট্র্যাজেডি কোনো আকস্মিক অঘটন নয়, বরং এটি রাজউক ও বেবিচকের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহের বছরের পর বছর ধরে চলা অবহেলা, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতারই এক অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। রাজউকের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দাবি করা হলেও বাস্তবে শাহজালাল ও তেজগাঁও— উভয় বিমানবন্দরের উড্ডয়ন পথ বা অ্যারোড্রোম এরিয়ায় অনিয়মের পাহাড় গড়ে উঠেছে।

বেবিচকের ৬০ পৃষ্ঠার গোপন নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের বিধি অনুযায়ী রানওয়ের ১৫ কিলোমিটার সীমার মধ্যে অবস্টাকল লিমিটেশন সারফেস অর্থাৎ ওএলএস বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। এ সকল সংরক্ষিত এলাকায় অবস্থানভেদে ভবনের উচ্চতা শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ ফুট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও অসাধু ডেভেলপাররা রাজউকের তোয়াক্কা না করে মাত্র তিনতলার অনুমোদন নিয়ে ছয় থেকে সাততলা ভবন হাঁকিয়ে বসেছে। নথিতে দেখা যায়, ওএলএস সীমানায় নির্মিত বিলাসবহুল হোটেল ‘হলিডে ইন’ ১৫০ ফুট অনুমোদিত উচ্চতার জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ২০০ ফুট। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, নিকুঞ্জ-২ এলাকায় অবস্থিত পাঁচ তারকা ‘হোটেল লা মেরিডিয়ান’ ১৫০ ফুট অনুমতি নিয়ে তৈরি করেছে ১৮০ ফুট উঁচু ইমারত, যার অনুকূলে বেবিচকের পেশ করা অনাপত্তিপত্রটি পুরোপুরি জাল ও ভুয়া বলে নথিতে নিশ্চিত করা হয়েছে।

তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ভিভিআইপি হেলিপ্যাডসংলগ্ন কাফরুল এবং শেওড়াপাড়া এলাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও বেবিচকের যৌথ অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে যে, যেসব স্থানে ভবনের সর্বোচ্চ সীমানা ছিল মাত্র শূন্য থেকে ১১ ফুট, সেখানে ২০ থেকে ১০৪ ফুট পর্যন্ত উঁচু বিশাল অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। মেসার্স বিল্ডার্স ও গ্রীন ভিউ হোমল্যান্ডের নয়তলা ভবন এর অন্যতম উদাহরণ, যার কারণে সামরিক ও বেসামরিক হেলিকপ্টার পরিচালনা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এছাড়া উত্তরার ৩, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন প্রধান সড়কের ওপর নির্মিত ডজন ডজন টাওয়ার, আলাউদ্দিন ট্রপিক্যাল টাওয়ার এবং কুড়িল এলাকার কুইন মেরি কলেজ ভবনটি নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ৯১ ফুট উঁচুতে (২৪১ ফুট) নির্মাণ করা হয়েছে। বারবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও এসব কাঠামোর বিষয়ে রাজউক কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

বিমান চলাচলের মতো সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চিহ্নিত অবৈধ ইমারতগুলো অনতিবিলম্বে গুঁড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। বেবিচক চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কোনো ভবন ভেঙে ফেলার সরাসরি আইনি এখতিয়ার তাদের হাতে নেই, তাই একাধিকবার তালিকা পাঠিয়ে রাজউককে তারা নিজস্ব দায়িত্ব পালনের তাগিদ দিয়েছেন। তবে রাজউকের পক্ষ থেকে যৌথ বৈঠক ও মোবাইল কোর্টের ফিরতি তাগিদ দেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এভাবে তদারকি সংস্থাগুলোর দায় ঠেলার মানসিকতা এবং সমন্বিত কঠোর আইনের অভাবে ঢাকার আকাশে যেকোনো মুহূর্তে আবারও বড় ধরণের মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন নগর ও পরিবহন পরিকল্পনাবিদরা।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...