শিরোনামঃ
ফ্রান্সের নতুন কোচ জিদান দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্নিকাণ্ডে ৬ বাংলাদেশি নিহত কক্সবাজারে শিশুকে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে যুবক গ্রেফতার মিরপুর কলেজের দেয়াল ধসে একজনের মৃত্যু, আহত অন্তত ৭ মিরসরাই শিল্পাঞ্চলে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহী তুরস্কের সানকো মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের সক্রিয় সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা: তথ্যমন্ত্রী বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর তদন্ত হওয়া দরকার: তথ্য উপদেষ্টা দেশীয় প্রযুক্তির ভেন্টিলেটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন প্রস্তুতকারকদের সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই : মির্জা ফখরুল
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন

ঢাকার আদালতপাড়ায় টাকায় মিলছে বিচারকের জাল স্বাক্ষর

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে টাকা ফেললেই মিলছে বিচারকদের স্বাক্ষর ও সিলমোহরযুক্ত আদালতের হরেক রকমের নকল ও জালিয়াতি করা নথি। গ্রেফতারি পরোয়ানা থেকে শুরু করে সমন, ভুয়া আইনি নোটিশ, মামলার সার্টিফাইড কপি, নোটারি হলফনামা কিংবা বিয়ের কাবিননামা—সবকিছুই এখন জালিয়াতি চক্রের হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছে। টাকার বিনিময়ে অবলীলায় তৈরি করা হচ্ছে আদালতের আদলে হুবহু জাল কাগজ। জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি এসব ভুয়া নথি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্লেকমেইলিং করে অর্থ আদায় এবং প্রতিপক্ষকে হয়রানির মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রতিনিয়ত চরম বিভ্রান্ত ও বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। অসাধু ফটোকপির দোকান, দালাল চক্র, কিছু নৈতিকতাহীন আইনজীবী ও আদালতের কতিপয় কর্মচারীর প্রত্যক্ষ যোগসাজশে ঢাকার অধস্তন আদালত প্রাঙ্গণে তৈরি হয়েছে এই মারাত্মক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আদালতের বিচারকদের ভুয়া সই ও কাউন্টার সিল ব্যবহার করে এমনকি তথাকথিত ‘কোর্ট ম্যারেজ’ বা নোটারি হলফনামা বানানোর মতো অপরাধও প্রকাশ্যে ঘটছে। বরগুনার একটি সিআর মামলায় সম্প্রতি দেখা যায় যে, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের ১ নম্বর ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের সিল ও স্বাক্ষর জালিয়াতি করে একটি নোটারি হলফনামা আদালতে জমা দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় হলফনামা রেজিস্টার পরীক্ষা করে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট স্মারক নম্বরে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যক্তির হলফনামা নিবন্ধিত আছে। তদন্তে বিচারকের সই ও সিলের জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

একইভাবে বিচারকের স্বাক্ষর জাল করে দূরদূরান্তের নির্দোষ মানুষদের হয়রানি করার উদ্দেশ্যে ভুয়া সমন পাঠানোর ঘটনাও সামনে এসেছে। টাঙ্গাইলের কালিহাতী এলাকার চারজন সাধারণ বাসিন্দার নামে ঢাকার সিএমএম আদালতের একটি মামলা উল্লেখ করে ভুয়া সমন পাঠানো হয়। সেখানে শাহবাগ থানার একটি মামলায় তাদের আদালতে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীরা আদালতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে মামলার কপিতে বা প্রসিকিউশন বিভাগের কোনো নথিতে তাদের নামের অস্তিত্বই নেই। সম্পূর্ণ অসাধু উপায়ে বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে এই ভুয়া সমন বানিয়ে নিরীহ লোকজনকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল।

আদালতের নথিপত্র জালিয়াতির পাশাপাশি ভাড়ায় আসামি খাটার মতো মারাত্মক অপরাধমূলক অপচর্চাও ধরা পড়েছে উত্তরা পূর্ব থানার একটি প্রতারণা মামলায়। সেখানে মামলার মূল এজাহারভুক্ত প্রকৃত নারী আসামির পরিবর্তে টাকার বিনিময়ে অন্য এক অপরিচিত নারীকে আদালতে আত্মসমর্পণ করিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। জামিন শুনানির দিনে বাদীপক্ষের সচেতন আইনজীবীর আপত্তির মুখে বিষয়টি নজরে এলে আদালত তাৎক্ষণিক পুলিশি তদন্তের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, আত্মসমর্পণকারী নারী টাকার বিনিময়ে আসল আসামিকে বাঁচাতে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন। আদালতে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন ও জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন দায়রা আদালত।

আদালতের এই জালিয়াতি ও জালিয়াতির চক্র কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। আদালতের আশপাশে থাকা গুটিকয়েক ফটোকপির দোকান এবং টাইপ রেডি করার দোকানকে কেন্দ্র করে এই নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয়। তারা কম্পিউটারে আসল নথির খসড়া বানিয়ে রাখা ডিজিটাল ফর্মে তথ্য বসায় এবং বিভিন্ন আসল ফাইল থেকে সংগৃহীত বিচারকের সই ও সিল ব্যবহার করে অবিকল কাগজ বানিয়ে ফেলে। অভিযোগ রয়েছে যে, আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারী টাকার লোভে আসল ফান্ডের নম্বর, স্মারক ও সইয়ের নমুনা এসব অসাধু চক্রের হাতে তুলে দেয়। এরপর মাঝের দালালরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব বিপজ্জনক ভুয়া কাগজপত্র ভুক্তভোগী ও প্রতারকদের কাছে পৌঁছে দেয়।

ঢাকার আদালতপাড়ার এমন চিত্র পুরো বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) মতো আন্তর্জাতিক তদারকি সংস্থাগুলো মনে করছে যে, এই প্রতারণা বন্ধের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো বিচারিক প্রক্রিয়ার পুরোপুরি ‘এন্ড-টু-এন্ড’ ডিজিটাল রূপান্তর বা ডিজিটাইজেশন নিশ্চিত করা। প্রতিটি জারি করা সমন, আদেশের কপি ও পরোয়ানায় কিউআর কোড (QR Code) ট্র্যাকিং এবং অনলাইন ভেরিফিকেশনের ব্যবস্থা থাকলে কোনো দালাল বা চক্র এভাবে নকল কাগজ তৈরি করে পার পেত না। দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু না করা পর্যন্ত বিচার ব্যবস্থাকে এই প্রতারক চক্রের হাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত করা কঠিন হবে।

এদিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষ ও পাবলিক প্রসিকিউটরদের (পিপি) মতে, এ ধরনের ঘটনা নজরে আসার সাথে সাথেই জড়িতদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা ও মামলা দায়ের করা হচ্ছে। আদালতসংশ্লিষ্ট কোনো কর্মচারী বা অন্য কোনো ব্যক্তি এর পেছনে জড়িত থাকলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। একই সাথে আদালত প্রাঙ্গণে ভ্রাম্যমাণ নজরদারি এবং কঠোর শাস্তির বিধান প্রয়োগ করে এই জালিয়াতি বন্ধের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। তবে এই ধরনের জালিয়াতি স্থায়ীভাবে রুখে দিতে দ্রুততম সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর বিচারিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের বড় দাবিতে পরিণত হয়েছে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...