জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ বা ‘সবুজ শক্তি’ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হলেও এর আড়ালে সৃষ্টি হচ্ছে এক মারাত্মক পরিবেশগত ঝুঁকি। উপযুক্ত পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং ব্যবস্থার অভাবে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও ইনভার্টারের মতো মেয়াদোত্তীর্ণ সরঞ্জাম থেকে নির্গত বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য নিঃশব্দে জমছে। পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ের একাধিক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, সৌরবিদ্যুতের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে যদি এখনই সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা এবং বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না তোলা হয়, তবে নিকট ভবিষ্যতে এই বিষাক্ত বর্জ্যের দাপট দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্য ও মাটির জন্য চরম হুমকিতে পরিণত হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্লাইমেট সেন্টারের এক সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে চালু থাকা সোলার প্যানেলগুলো থেকে অদূর ভবিষ্যতে প্রায় ৩৩ হাজার টনেরও বেশি ই-বর্জ্য জমা হবে। আশার কথা হলো, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই বর্জ্য ভেঙে ২৪ হাজার টনের বেশি কাচ, আড়াই হাজার টনের ওপর অ্যালুমিনিয়াম এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সিলিকন ও তামা পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে উদ্ধার করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশে কার্যকর ও নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণের সরকারি কোনো পরিকল্পনা না থাকায় এগুলোতে থাকা সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ক্ষতিকর ধাতু বিষে রূপ নিয়ে প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। গবেষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দশকের মধ্যে দেশের সোলার কেন্দ্রিক ই-বর্জ্যের পরিমাণ কয়েক লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনেও পরিবেশবান্ধব সবুজ শক্তির এই উল্টো পিঠকে এক উদীয়মান জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অনুমান অনুযায়ী ২০২৫ থেকে পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যে সোলার প্যানেল থেকে প্রায় ৫৫ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংস্থাটির পর্যালোচনা বলছে, ২০২১ সালে সরকার ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ প্রণয়ন করলেও তা বাস্তবায়নে পরিবেশ মন্ত্রণালয় কিংবা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। একই সাথে দেশে পুরোনো ও মানহীন ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানির ওপর স্পষ্ট বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও তা অবাধে দেশে প্রবেশ করছে, যা এই ই-বর্জ্যের সমস্যাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দেশে বর্তমানে তৈরি হওয়া মোট ই-বর্জ্যের প্রায় ৯৭ শতাংশই কোনো ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ছাড়া অনানুষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে ভাঙার কাজ চলে। রাজধানীর পুরান ঢাকা কিংবা বিভিন্ন স্ক্র্যাপ মার্কেটে খোলা আকাশের নিচে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে, এসিড ঢেলে অথবা আগুনে পুড়িয়ে মেটাল বা ধাতু সংগ্রহের কাজ করা হচ্ছে। এর ফলে মারাত্মক বিষাক্ত ধোঁয়া ও কেমিক্যাল বায়ু, পানি ও মাটির সঙ্গে মিশে চারপাশ দূষিত করে ফেলছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রায় ৫০ হাজারের মতো অবহেলিত শিশুশ্রমিক জড়িত রয়েছে, যারা প্রতিদিন সরাসরি ক্যাডমিয়াম ও সিসার সংস্পর্শে এসে শ্বাসকষ্ট, স্নায়বিক দুর্বলতা, চর্মরোগ এবং কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে।
জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুফল পেতে গিয়ে যেন আমরা কোনো নতুন দুর্যোগ ডেকে না আনি, সেদিকে কড়া নজর দিতে হবে। থ্রি-আর (Reduce, Reuse, Recycle) নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা চক্রাকার অর্থনৈতিক মডেল চালু করা এখন সময়ের বড় দাবি। যার মাধ্যমে সোলার প্যানেল বা ব্যাটারি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মেয়াদকোঠা শেষে তাদের বিক্রি করা সরঞ্জাম গ্রাহকের কাছ থেকে ফেরত নিতে বাধ্য থাকবে। একই সাথে সোলার হোম সিস্টেমের জন্য ব্যবহৃত ব্যাটারি ও প্যানেলের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কড়া তদারকি ও আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা করাও অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, রাজধানীভিত্তিক ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন জানিয়েছে যে তারা গৃহস্থালি ও অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করতে রিসোর্স রিকভারি সেন্টার ও এমআরএফ (ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফেসিলিটি) প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির এসব প্ল্যান্ট চালু হলে প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তেল এবং জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরির পাশাপাশি ই-বর্জ্যগুলোকে আলাদা করে রিসাইক্লিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটাতে হলে আমদানিনির্ভর নিম্নমানের সরঞ্জাম বন্ধ করা, আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং উৎপাদনকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা ব্যতিরেকে এই নিরব সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট