ভার্চুয়াল জগতে বিরামহীন মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং চরিত্র হনন রুখতে পাস হওয়ার স্বল্প সময়ের মধ্যেই ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ নতুন করে সংশোধনের বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খসড়া বিলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসত্য তথ্য বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অপব্যবহারের মাধ্যমে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড এবং চল্লিশ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের মতো কঠোর আইনি শাস্তির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভুয়া অডিও ও ভিডিও বানানোর অপরাধ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী জাতীয় সংসদ অধিবেশনেই পাস করার উদ্দেশ্যে সংশোধিত এই বিল উত্থাপন করা, যা দেশের সাইবার পরিসরকে নিরাপদ রাখতে আইনি দেয়ালকে বহু গুণে শক্ত করবে।
সংশোধিত আইনের খসড়ায় মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে গুজব ও ইচ্ছাকৃত অপতথ্য প্রকাশের নতুন সংজ্ঞায়ন ও এর নির্দিষ্ট সাজার ওপর। যেকোনো অসমর্থিত সংবাদ যা জনমনে অযাচিত আতঙ্ক বা বিভ্রান্তির জন্ম দেয়, সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ দশ বছরের জেল বা চল্লিশ লাখ টাকা জরিমানার মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মান ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা রটানো হলে তাকেও সমান অপরাধী ধরা হবে। অন্যদিকে নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের লক্ষ্য করে এআই বা কোনো প্রযুক্তিগত কৌশলে তৈরি বিকৃত মানহানিকর কনটেন্ট ছড়ানো হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই ধরণের কঠোরতম সাজা প্রয়োগ করার ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। অপরাধীদের দমনে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় থাকা মানহানির আন্তর্জাতিক বা সর্বজনীন মানদণ্ড অনুসরণ করে শাস্তির তীব্রতা নিশ্চিতের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আইনের বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে এবার কেবল প্রথাগত পুলিশ বাহিনীর ওপর ছেড়ে না দিয়ে সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত বিশেষায়িত সংস্থাকেও তদারকির মূল দায়িত্বে আনা হচ্ছে। সরকারের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মুহূর্তেই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে সাধারণ তদন্ত পদ্ধতিতে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত প্রযুক্তিভিত্তিক মনিটরিং সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) সরাসরি মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও সহায়তার দ্বায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সরকারি বিভাগগুলোর সংযোগ ব্যতিরেকে সাইবার জগতের এই বিশৃঙ্খলা রোধ করা কার্যত অসম্ভব বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা।
সামাজিক মাধ্যম এখন মুক্ত আলোচনার চেয়ে রাজনৈতিক শত্রুতা মেটানো ও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ চড়ানোর হাতিয়ার বা ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর ক্ষতিকর প্রভাব দিনে দিনে আরও গভীর হচ্ছে। গবেষণা সংস্থার তথ্য বলছে, এক বছরের ব্যবধানে দেশে বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্যের বিস্তার এক লাফেই প্রায় ত্রিশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারণ সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সঠিক উৎস যাচাই না করেই চটকদার সংবাদ শেয়ার দেওয়ার প্রবণতা এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর বিশেষ অ্যালগরিদম কৌশল, যা আবেগপ্রবণ কনটেন্টকে ঝড়ের গতিতে কোটি কোটি মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমের এই অপপ্রচারের শিকার হয়ে অবর্ণনীয় সামাজিকভাবে অপূরণীয় মানসিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, কেবল আইন সংশোধন বা সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে ভার্চুয়াল পরিসরে অপরাধ শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, যদি না প্রান্তিক ব্যবহারকারীদের সচেতন করা সম্ভব হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞান বা ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ না থাকার দরুন অনেকে অজান্তেই মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। তাছাড়া অনলাইন জুয়ার মতো আশঙ্কাজনক সাইবার অপরাধকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখার সিদ্ধান্তকেও কিছুটা অপরিনামদর্শী বলে সতর্ক করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে কঠোর আইনের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারিগরি সক্ষমতা বহু গুণে বাড়ানোই হতে পারে নিরাপদ সাইবার জগৎ গড়ার মূল চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ