শিরোনামঃ
দালাল ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: ৩০ হাজার কোটির অদৃশ্য ভিসা বাণিজ্য মানিকগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ: ঠিকানা বদলেই খরচ বাড়ছে ৬৭২ কোটি টাকা পরিকল্পনার অভাবে নষ্ট হচ্ছে সক্ষমতা: জনবল সংকটে অচল আড়াইশ আইসিইউ বিশ্বজুড়ে আবারও বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু: ডব্লিউএইচও কঠোর নিরাপত্তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে ইউরেনিয়াম চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশকে থামাতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র ইলন মাস্কের সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে যে বার্তা দিলেন জিলিস কোনো অন্যায়কে বিএনপি সরকার ছাড় দেবে না: প্রতিমন্ত্রী টুকু আখতারুজ্জামানের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে মুক্তি দিতে হবে: গোলাম পরওয়ার মাল্টার কেজি ৫২০ টাকা, দাম নিয়ে ব্যবসায়ীদের জবাব চাইলেন বাণিজ্যমন্ত্রী
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ন

দালাল ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: ৩০ হাজার কোটির অদৃশ্য ভিসা বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশী যুবক নিজেদের ভিটেমাটি বিক্রি করে, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কিংবা পরিবারের শেষ সম্বলটুকু বন্ধক রেখে বিদেশে পাড়ি জমান। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিদেশে যাওয়ার আগেই দেশের অভ্যন্তরে এক নির্মম শোষণের শিকার হন। একটি সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত বিশাল এক অদৃশ্য ভিসা বাণিজ্যের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিদেশে পাড়ি জমানোর পর তাদের অনেকেই আবিষ্কার করেন যে, যে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। মাসের পর মাস কাজ ছাড়া ভিনদেশে বেকার পড়ে থাকতে হয় তাদের। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বিদেশের মাটিতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং পেটের ক্ষুধা মেটাতে উল্টো দেশের বাড়ি থেকে টাকা নিতে বাধ্য হন এই হতভাগ্য কর্মীরা। শেষ পর্যন্ত বিদেশের মাটিতে টিকতে না পেরে একবুক হতাশা ও পাহাড়সম ঋণের বোঝা নিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন অসংখ্য অভিবাসী শ্রমিক।
বিদেশগামী এই কর্মীদের একটি বড় অংশই জানেন না যে তারা গন্তব্য দেশে গিয়ে আসলে কী কাজ করবেন, তাদের নির্দিষ্ট বেতন কত হবে অথবা কাজের শর্তগুলো কী কী। এর মূল কারণ হলো বিদেশী নিয়োগকর্তার কাছ থেকে প্রকৃত চুক্তিপত্র সংগ্রহ না করে ভুয়া বা বানোয়াট চুক্তিপত্র ধরিয়ে দেওয়া। অভিযোগ রয়েছে, দালাল, মধ্যস্থতাকারী এবং অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের মনগড়া শর্তাবলি দিয়ে এসব ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নিরীহ কর্মীদের হাতে ধরিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে গিয়ে কর্মীরা দেখেন যে, তাদের চুক্তিপত্রের সঙ্গে প্রকৃত নিয়োগকর্তা, কাজের ধরন বা বেতনের বিন্দুমাত্র মিল নেই। এই পুরো প্রতারণার জালটি বোনা হয় শুধুমাত্র ভিসা কেনাবেচার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে।
প্রবাসী কর্মীদের ঘামে অর্জিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলেও, এই খাতের আড়ালে নীরবে গড়ে উঠেছে বিশাল এক অঘোষিত ও অবৈধ বাজার। এই অবৈধ লেনদেনের কোনো সুনির্দিষ্ট বা সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এর ভয়াবহ আকার সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। গত বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩শ ৬০ জন কর্মী ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এর মধ্যে শীর্ষ দশটি দেশে যাওয়া কর্মীদের জন্য সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী মোট খরচ হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৬শ ১০ কোটি টাকা। এই টাকার ভেতরে রিক্রুটিং এজেন্সির সার্ভিস চার্জ, বিমানের টিকিট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ফি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ ফি এবং স্মার্ট কার্ডসহ বৈধ প্রক্রিয়ার যাবতীয় খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আঁতকে ওঠার মতো। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, সরকার নির্ধারিত খরচের ধারেকাছেও নেই প্রকৃত অভিবাসন ব্যয়। সর্বনিম্ন প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব ধরলেও গত বছর বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৫শ ৬৭ কোটি টাকার ওপরে। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত হিসেবের চেয়ে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা বেশি খরচ করতে বাধ্য হয়েছেন নিরীহ কর্মীরা। খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে ভিসা কেনাবেচা, দালালদের মাত্রাতিরিক্ত কমিশন এবং বিভিন্ন স্তরের অবৈধ লেনদেনের পেছনে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই অদৃশ্য ও অবৈধ ভিসা বাণিজ্যের আকার বছরে কমপক্ষে ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বের করে নেওয়া হচ্ছে।
এই অবৈধ ভিসা বাণিজ্যের নেপথ্যের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং তা বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সৌদি আরবের একটি ভিসার প্রাথমিক বা সরকারি খরচ মাত্র দুই হাজার রিয়াল, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৭০ হাজার টাকার সমতুল্য। কিন্তু এই ভিসা যখন সংগ্রহ করা হয়, তখনই এর সঙ্গে এক থেকে দেড় লাখ টাকা অতিরিক্ত যুক্ত হয়ে যায়। অনেক সৌদি স্পন্সর বা ‘কফিল’ আছেন, যাদের বাস্তবে কোনো কর্মীর প্রয়োজন নেই, কিন্তু তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া চাহিদাপত্র বের করে প্রতিটি ভিসার বিপরীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন। এই ভিসাগুলো যখন বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি এবং দালালদের হাতে এসে পৌঁছায়, তখন অন্তত ছয় থেকে সাত দফা হাতবদল হয়ে এর দাম প্রাথমিক খরচের তিন থেকে চার গুণ বেড়ে যায়। এমনকি পরবর্তীতে ভিসা বা ইকামা নবায়নের সময়ও ওই কফিলকে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ আর্থসামাজিক জরিপের তথ্য এই দুর্নীতির মাত্রা আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। জরিপ অনুযায়ী, বিদেশগামী কর্মীদের মোট খরচের ৫২ দশমিক ৩ শতাংশই চলে যায় দালাল বা মধ্যস্থতাকারীদের পকেটে। গ্রামাঞ্চলে এই দালালির হার আরও ভয়ংকর। অন্যদিকে ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থ যায় রিক্রুটিং এজেন্সির হাতে, আর সরাসরি সরকারি খাতে জমা হয় মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থ। অর্থাৎ, পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াই দালালদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্যরাও স্বীকার করেছেন যে, বিদেশী নিয়োগকর্তা ও দেশীয় এজেন্সির মধ্যবর্তী শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই ভিসা বাণিজ্যের প্রধান কুশীলব। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সিস্টেম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত হতে একেকটি এজেন্সিকে কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিতে হয়, যার পুরো দায়ভার শেষ পর্যন্ত ওই নিরীহ শ্রমিকের ঘাড়েই চাপে।
টিআইবির এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বিদেশী নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে এই ভিসাগুলো কেনার জন্য হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট বছরেই ভিসা কেনার নাম করে আনুমানিক পাঁচ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়। গন্তব্য দেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোর অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে যাচাই-বাছাই ছাড়াই টাকার বিনিময়ে চাহিদাপত্র বা ডিমান্ড লেটার সত্যায়ন করার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে এই প্রতিবেদনে। প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত ফি ও কমিশন যুক্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অভিবাসন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালে দেশভিত্তিক একটি অভিবাসন খরচ নির্ধারণ করে দিলেও, বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। সরকার নির্ধারিত খরচ অনুযায়ী সৌদি আরবে যাওয়ার কথা এক লাখ ৬৫ হাজার টাকায়, কিন্তু বাস্তবে লাগছে পাঁচ থেকে নয় লাখ টাকা পর্যন্ত। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার নির্ধারিত খরচ এক লাখ টাকার নিচে হলেও, কর্মীদের গুনতে হচ্ছে পাঁচ থেকে আট লাখ টাকা। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে, সেখানে নির্ধারিত খরচ আড়াই লাখ টাকার কাছাকাছি হলেও একজন কর্মীকে সিঙ্গাপুর যেতে পনেরো থেকে আঠারো লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই খরচের মাত্রা ষোল থেকে পঁচিশ লাখ টাকা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশী কর্মীদেরই সবচেয়ে বেশি অভিবাসন ব্যয় বহন করতে হয়। এর অন্যতম কারণ হলো দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা রিক্রুটিং এজেন্সি। বিএমইটির তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে দুই হাজার ৮শ ৬০টি রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে, যেখানে বিশাল জনসংখ্যার দেশ ভারতে এই সংখ্যা মাত্র এক হাজার ৯শ ৮৮টি। এই বিপুল সংখ্যক এজেন্সির মধ্যে তীব্র অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং মাঠপর্যায়ের দালালদের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা ভিসা বাণিজ্যকে উসকে দিচ্ছে। দালালদের কোনো আইনি কাঠামোর আওতায় না আনায় তারা নির্বিঘ্নে কর্মীদের প্রতারিত করে যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্মীরা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের হাতে ভুয়া চুক্তিপত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়, যখন তাদের আর ফিরে আসার কোনো উপায় থাকে না।
এই অরাজকতা বন্ধে বায়রার পক্ষ থেকে একটি সর্বজনীন ডেটাব্যাংক তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে এবং সব ধরনের লেনদেন প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক বা নির্ধারিত ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে হওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশী কর্মীদের কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতার অভাবেই তারা দরকষাকষিতে পিছিয়ে পড়ছেন। ভারত বা নেপালের কর্মীরা দক্ষ হওয়ার কারণে তারা বিনা খরচে বা কম খরচে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পান। তাই শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যার দিকে নজর না দিয়ে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দিকে সরকারকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। সরকার যদি এখনই এই অদৃশ্য ভিসা বাণিজ্যের লাগাম টেনে না ধরে, তবে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই নীরব কান্না কখনোই থামবে না।

 

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...