মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ, শিল্প ও কৃষি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং রাসায়নিক সারের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এই অঞ্চলনির্ভর হওয়ায় সরকার এখন জরুরি কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীলতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই বহুমুখী ঝুঁকি সামাল দিতে পেট্রোবাংলা, বিপিসি এবং কৃষি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বিকল্প উৎসের সন্ধান ও দীর্ঘমেয়াদী মজুত গড়ে তোলার ছক কষছে।
বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত এলএনজি সরবরাহ নিয়ে সরকারের উদ্বেগ এখন সবচেয়ে বেশি। দেশীয় খনিগুলো থেকে স্বাভাবিক গ্যাস উত্তোলন ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর জাতীয় নির্ভরতা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বে কাতার ও ওমানের সাথে দীর্ঘমেয়াদী জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করা গেলেও, সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থার কারণে সেই পথগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশকে চড়া দামে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কার্গো কিনতে হচ্ছে, যা সরকারি কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি অনুমোদন পাওয়া প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কার্গো কেনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের গানভর কোম্পানির সাথে ভবিষ্যৎ চুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও, যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে জাহাজ ঘুরিয়ে নেওয়া বা বিশ্ববাজারে কৃত্রিম দরবৃদ্ধির তিক্ত অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে।
শিল্প ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন খাতকে সচল রাখতে জ্বালানি তেলের অন্তত ৯০ দিনের কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করার এক বিশাল পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনায় বাংলাদেশ রেলওয়ে, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ এবং বেসরকারি খাতের বিদ্যমান তেল সংরক্ষণাগারগুলোকে একত্রিত করে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিপিসির ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হবে, যার মধ্যে ৬৮ লাখ টনেরও বেশি পরিশোধিত তেল রয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির কারণে সমুদ্র পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় জিটুজি প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশের সাথে অন্তত ১৬ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেল ক্রয়ের প্রশাসনিক আলোচনা ত্বরান্বিত করা হয়েছে।
কৃষি ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সারের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখাও বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। প্রতিবছর দেশে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি মিলিয়ে লাখ লাখ টন সারের প্রয়োজন হয়, যার সিংহভাগই বৈদেশিক আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া সার কারখানাগুলো তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পারায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর নৌপথ এড়াতে সরকার এখন বিকল্প দেশ হিসেবে ব্রুনাই, মরক্কো, মালয়েশিয়া, চীন, কানাডা ও তিউনিসিয়ার সাথে নতুন সরবরাহ চুক্তির রূপরেখা তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান এই সংকটকালে অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় বিবেচ্য বিষয় নয়; বরং মূল অগ্রাধিকার হলো যে কোনো মূল্যে সার ও জ্বালানির সার্বিক সরবরাহ সচল রাখা।
আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে দেশের উৎপাদন ও সামাজিক খাতের ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আমদানিকৃত পণ্যের বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর দ্বিগুণ চাপ পড়বে এবং সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হবে। যদি এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং বিকল্প উৎসের প্রয়োগ ধীরগতিতে চলে, তবে দেশীয় শিল্প কারখানা বন্ধের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির পারদ নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। তাই সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সারের যোগান নিশ্চিতকরণ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত কৌশলগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে।
তথ্যসূত্র: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড