জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে দেশের তরুণ জনশক্তি এক বিশাল শক্তির উৎস হলেও বর্তমানে উচ্চ শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে চরম অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক প্রশাসনিক হিসাব ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে দেশের প্রতি চারজন তরুণের একজন এখন সম্পূর্ণ কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী উদীয়মান জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ তরুণী শিক্ষা, চাকরি কিংবা যেকোনো ধরণের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের বাইরে অবস্থান করছেন। বিশেষ করে নারী সমাজের ক্ষেত্রে এই চিত্র আরও নাজুক এবং কর্মহীনতার এই বিশাল পরিসংখ্যানে নারীদের উপস্থিতি প্রায় ৬০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন যে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব ও জনসম্পদের এই অপচয় দেশের সামগ্রিক ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা অর্জনের পথকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
দেশের সরকারি শ্রমশক্তি জরিপ ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী কেবল উচ্চতর ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যাই এখন ৯ লাখ ছুঁইছুঁই। বিগত আট বছরের ব্যবধানে এই উচ্চশিক্ষিত কর্মহীনের সংখ্যা দ্বিগুণের চেয়েও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে যা যেকোনো আধুনিক অর্থনীতির জন্য চরম সংকেত। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বৃদ্ধির সাথে সাথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেতে দেখা গেলেও বাংলাদেশে এর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুকরণ ঘটছে। যে সকল নাগরিকের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার সর্বনিম্ন হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় অতিক্রম করা শিক্ষিতদের মধ্যে তা প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। প্রতি বছর স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী লাখ লাখ শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশ বছরের পর বছর চাকরির জন্য হাহাকার করছেন যা দেশের আনুষ্ঠানিক নিয়োগ ব্যবস্থার বিশাল দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে।
শিক্ষাবিদ ও অর্থনৈতিক গবেষকদের মতে দেশে কেবল গ্র্যাজুয়েট বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু বাজারমুখী শিক্ষার অভাবে তা উপযুক্ত কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হতে পারছে না। প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষার সনদ নিয়ে বের হলেও জাতীয় অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিধারায় বড়জোর ৩ লাখের মতো গ্র্যাজুয়েটকে কাজের সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে প্রতি বছর চার লাখেরও বেশি অতিরিক্ত শিক্ষিত যুবক বেকারের তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন। তাছাড়া বিপুল সংখ্যক তরুণ বিসিএস বা অন্যান্য সরকারি চাকরির পেছনে দীর্ঘ সময় ও বয়স ব্যয় করছেন যা শ্রম অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও বাজার চাহিদার মধ্যকার এই অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্বের কারণে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জনের পরও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্যতা প্রমাণে হিমশিম খাচ্ছেন।
বেকারত্বের এই ক্রমবর্ধমান ধারা কেবল আর্থিক সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বরং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। তরুণ সমাজের জন্য নিরাপদ যাতায়াত, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নারী শিক্ষার পাশাপাশি যথাযথ কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত না করা গেলে উন্নয়ন পরিকল্পনা অধরাই থেকে যাবে। অতীতে কোটা আন্দোলন বা অন্যান্য ছাত্র আন্দোলনের মূল নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকাই ক্ষোভকে তীব্র করে তুলেছিল। সরকার বিভিন্ন সময় সংস্কার কমিশন ও টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিল্প খাতের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরাসরি যোগাযোগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো চমৎকার সব পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও বাস্তবায়নের গতি এখনো সন্তোষজনক নয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গড় বয়স যেখানে ২৬ থেকে ২৭ বছর সেখানে এই বিপুল কার্যক্ষম জনগোষ্ঠীকে দ্রুত উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করা অত্যন্ত আবশ্যক। শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগের চাহিদানুযায়ী পুনর্বিন্যাস করা, দেশি ও বৈচিত্র্যময় বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং ডিগ্রিভিত্তিক শিক্ষার চেয়ে দক্ষতার ওপর গুরুত্ব বাড়ানোই হতে পারে প্রধান সমাধান। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দ্রুত শিল্পায়ন ও টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারলে এই বিপুল সম্ভাবনাময় তরুণ জনশক্তি একদিন মানবসম্পদের পরিবর্তে সমাজের জন্য ভারী বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তরুণদের হাতে সময়মতো সঠিক কাজ তুলে দেওয়া এবং কর্মসংস্থানে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করাই এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: দ্যা পোস্ট