শিরোনামঃ
গৃহশিক্ষক নির্বাচন: কিছু অভিজ্ঞতা, কিছু পরামর্শ সরকারের সমালোচনা অপরাধ নয়, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলা অপরাধ : তথ্যমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক স্থাপনা স্থাপন করতে চাই: মির্জা ফখরুল ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলেই মিলবে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় ঢাকায় ফের ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ, যুক্ত হতে পারে বেসরকারি খাত বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বৈঠক সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পর্যায়ক্রমে স্কুল মিল চালু করা হবে: গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ঢাকার চারপাশের নৌপথ সচলের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে ৪ জনের মৃত্যু ঠাকুরগাঁওয়ে বজ্রাঘাতে দুইজনের মৃত্যু
সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:০২ পূর্বাহ্ন

সৌদি জোটে ঢাকা! ক্ষুব্ধ হবে ইরান?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ ও সমুদ্রসীমার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় কৌশলগত অর্থনীতি এবং জাতীয় সমুদ্র নিরাপত্তায় এটি যেমন ঢাকার জন্য এক বিশাল ইতিবাচক সুযোগ এনে দিয়েছে, ঠিক তেমনই মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ও স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক মেরুকরণে তৈরি করেছে সম্পূর্ণ নতুন এক ভারসাম্যমূলক সমীকরণ। বিশেষ করে কৌশলগত মধ্যপ্রাচ্যে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার টানাপোড়েনের মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে নিজেদের ঐতিহ্যগত নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিশ্লেষণ চলছে। এই সামরিক ও বাণিজ্যিক জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে তেহরানের সাথে ঢাকার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ওপর কী ধরনের বার্তা যাচ্ছে, সেটাই এখন কূটনীতির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

প্রশাসনিক ও নীতিগত দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বা জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ভূরাজনৈতিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বে পাঠানো রপ্তানি পণ্যের একটি বিশাল অংশ সুয়েজ খাল এবং বাব আল মানদেব প্রণালীর সংকীর্ণ ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর জলপথ ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছায়। সাম্প্রতিক সময়ে এই আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোতে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণ, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জলদস্যুতার আধিপত্য বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পুরো বাণিজ্যিক পথটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রধানতম কেন্দ্র হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে যে দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা রয়েছে, তা সরাসরি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিকভাবে এই অংশগ্রহণকে সাধারণ সামরিক জোট মনে হলেও এর পেছনে মূলত অর্থনৈতিক সুরক্ষার বিষয় কাজ করছে। বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করে আসা ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ এই নিরপেক্ষ নীতির ওপর ভিত্তি করেই নিজেদের অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট করেছে। ঢাকা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা সংঘাত তৈরি এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য নয়। বরং বৈশ্বিক সমুদ্রপথে সন্ত্রাসী হামলা, জলদস্যুতা প্রতিরোধ এবং মুক্ত বাণিজ্যিক প্রবাহ সচল রাখাই এই জোটের প্রধান লক্ষ্য। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও মুক্ত নৌপথের নিরাপত্তা ইরানের মতো বাণিজ্য নির্ভর দেশের জন্যও সমানভাবে প্রয়োজনীয়, তাই তেহরান বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তকে বৈরিতা হিসেবে না দেখে বাণিজ্যিক নিরাপত্তা রক্ষার তাগিদ হিসেবে মূল্যায়ন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পটভূমির ইতিবাচক পরিবর্তনও এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক নমনীয়তাকে সহায়তা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক মধ্যস্থতায় সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্স্থাপিত হওয়ার ফলে ওই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান স্নায়ুযুদ্ধ ও বৈরিতা অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। ফলে রিয়াদের নেতৃত্বাধীন কোনো প্রতিরক্ষামূলক জোটে যুক্ত হওয়া মানেই যে সরাসরি তেহরানের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া—এমন ধারার পুরোনো চিন্তা এখন আর পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। তদুপরি, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের প্রায় ৩৫ লাখ প্রবাসী কর্মী কর্মরত রয়েছেন, যাদের কষ্টার্জিত রেমিটেন্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। রেমিটেন্সের ধারা অব্যাহত রাখা, জ্বালানি তেলের ধারাবাহিক জোগান নিশ্চিত করা এবং একই সাথে ইরানের সাথে সুদৃঢ় সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করেই কূটনৈতিক পদক্ষেপ ফেলছে ঢাকা।

তবে এই জোটকে কেন্দ্র করে ইরানের সাথে সাময়িক কূটনৈতিক টানাপোড়েন বা অস্বস্তি তৈরি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ লুকিয়ে আছে লোহিত সাগর ও বাব আল মানদেব প্রণালীর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং ইয়েমেনের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বৈশ্বিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাগুলোতে। যেহেতু এসব আঞ্চলিক গোষ্ঠী ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত, তাই আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা জোটের মাধ্যমে তাদের তৎপরতা ঠেকানোর এই উদ্যোগকে তেহরান কিছুটা হলেও পরোক্ষ রাজনৈতিক চাপ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তবে বাংলাদেশ শুরু থেকেই কোনো প্রকার আঞ্চলিক যুদ্ধ বা ব্লকে যোগ না দিয়ে কেবল আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন সচল রাখার বার্তা দিয়ে আসছে। সরকারের এই কৌশলী ও প্রাজ্ঞ ভূমিকার কারণে তেহরানের সাথে সরাসরি কোনো স্থায়ী বড় ধরণের দ্বিপক্ষীয় সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি নেই বলেই কূটনৈতিক মহল মনে করছে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


এ জাতীয় আরো খবর...