ইউরোপের শান্ত ও উন্নত দেশগুলোর বুকে সাম্প্রতিক সময়ে এক নতুন ও বীভৎস অপরাধের ধারা ডালপালা মেলে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গেমের ধাঁচে কৌশল সাজিয়ে অতি কম বয়সী তরুণ এবং কিশোরদের অর্থের বিনিময়ে ঘাতক হিসেবে ব্যবহার করছে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো। এই ভাড়াটে অপরাধীদের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিল করার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। ভিডিও গেমের ভার্চুয়াল জগতের মতো নিপুণভাবে মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশনা দিয়ে অপরাধ সঘটিত করার এই ধারণাকে অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন “ভায়োলেন্স-অ্যাজ-এ-সার্ভিস” (VaaS)। অপরাধী দলগুলোর এমন কৌশলী আউটসোর্সিং ব্যবস্থার কারণে এখন পশ্চিমা দেশগুলোতে দিন দিন বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক ঘাতকদের উপস্থিতি এবং তাদের হাতে সাধারণ নিরাপরাধ মানুষের অপমৃত্যু।
এই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ও আলোচিত নাম হলো ‘ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক’। ২০২২ সালের পর থেকে ইউরোপ মহাদেশজুড়ে প্রায় ৩৫টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারিগর হিসেবে এই অপরাধী গোষ্ঠীটিকে দায়ী করা হয়ে থাকে। কেবল নিজেদের সীমান্তকেন্দ্রিক মাদকের রাজ্য বিস্তার বা স্থানীয় গ্যাংগুলোর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যেই এদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের মাটিতে থাকা ইসরায়েলি বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হ্যান্ড গ্রেনেড ও বিস্ফোরক হামলা চালানো এবং পরবর্তীতে তা ব্যর্থ করার মতো অন্তত কয়েকটি আন্তর্জাতিক নাশকতায় এদের সরাসরি সংযোগ চিহ্নিত করেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। কিন্তু এসব হামলা পরিচালনা করার জন্য এই অপরাধী চক্রটি যাদের বেছে নেয়, তারা হলো সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত, মানসিক অসুস্থতায় ভুগতে থাকা এবং বিভ্রান্ত কিশোর সমাজ। অতি সহজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রলোভন দেখিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে তাদের মাথায় অপরাধের বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে এক মর্মান্তিক ও বিচিত্র কার্যপদ্ধতি। অপরাধী চক্রটি এসব তরুণ ঘাতকদের মোটা অঙ্কের টাকার টোপ দিয়ে হত্যাকাণ্ডে উৎসাহিত করলেও বাস্তবে তাদের প্রায় কাউকেই কোনো পারিশ্রমিক বা চুক্তিভিত্তিক অর্থ পরিশোধ করা হয় না। কারণ অপরাধ সংঘটন শেষে কিংবা পুলিশি অভিযানে এদের অধিকাংশকেই ঘটনাস্থল অথবা তার আশপাশ থেকে গ্রেপ্তার হতে হয়। যেহেতু তারা ধরা পড়ে যায়, তাই ফক্সট্রটের মতো আন্তর্জাতিক চক্রগুলোকে শেষ পর্যন্ত সেই বিশাল অঙ্কের টাকা আর কাউকেই গুনতে হয় না। অধিকন্তু, কম বয়সী কিশোরদের বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে এক নির্মম বাস্তবমুখী কৌশল। অল্প বয়সের কারণে তারা চরম ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার পরিণতি বা দীর্ঘমেয়াদী আইনি সাজা নিয়ে বিশেষ ভেবে দেখে না। ফলে অপরাধের জগতে এদের সহজ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারায় গ্যাংপ্রধানদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়।
এরকমই এক হৃদয়বিদারক নজির ঘটেছিল সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের উপশহরে। শীতের এক গভীর রাতে রেস্তোরাঁর ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন মুরাদ আবদেলকাদের নামের ২০ বছর বয়সী এক নিরীহ শিক্ষার্থী। সেই অন্ধকারের মধ্যে আতিলা আজিমভ নামের ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ অস্ত্র হাতে তার দিকে এগিয়ে যায় এবং এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে নিথর দেহের মাথায় শেষ শটটি করে। পরবর্তীতে জানা যায়, টাকার লোভে অপরাধী চক্রের হয়ে চুক্তিভিত্তিক খুনে নামলেও আজিমভ বস্তুত ভুল মানুষকে হত্যা করেছিল। সামান্য টাকার লোভে পড়ে এক সম্পূর্ণ নির্দোষ যুবকের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার দায়ে তাকে এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হচ্ছে। ঠিক একইভাবে নরওয়ের আরেক কিশোর ইয়োহানেস নাটল্যান্ড মানসিক টানাপোড়েনের সুযোগে অনলাইন নেটওয়ার্কের ফাঁদে পা দিয়ে যুক্তরাজ্যে এক পরিকল্পিত খুনের মিশন সম্পন্ন করতে গিয়ে ইংল্যান্ডের মাটিতে হাতেনাতে গ্রেফতার হয়।
প্রযুক্তি ও তরুণ মনস্তত্ত্বকে পুঁজি করে পরিচালিত এই কিলিং নেটওয়ার্কের পেছনে কম্পিউটার গেমের উপাদান যুক্ত করা হয়েছে অত্যন্ত সচেতনভাবে। ঘাতকদের কোনো একটি টার্গেট বা লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়ার পর তাদের ধাপে ধাপে নির্দেশনা দেওয়া হয় মেসেজিং অ্যাপ সিগন্যালের মতো এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মে। মিশন বাস্তবায়ন করতে তাদের মানচিত্র বা ভিডিও বানিয়ে গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও টাকার সন্ধান দেওয়া হয়, যা দেখতে হুবহু কোনো ‘অ্যাকশন গেমের’ টাস্কের মতো লাগে। যেমনটি দেখা গেছে নাটল্যান্ডের ক্ষেত্রে, যাকে এক ছদ্মনামী নির্দেশক গেমের ভঙ্গিতে একের পর এক বার্তা পাঠিয়ে এয়ারলাইনের টিকিট কেটে ম্যানচেস্টার বিমানবন্দর হয়ে একটি বনাঞ্চলের গোপনে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রের ঠিকানায় পৌঁছে দেয়। তাদের এই রোমাঞ্চকর ভাবমূর্তি কিশোরদের চরমভাবে আকৃষ্ট করে তোলে।
অপরাধী দল ফক্সট্রটের ভৌগোলিক বিস্তার ও এর শীর্ষ নেতৃত্বের উত্থান ভূরাজনৈতিক মাত্রাকেও স্পর্শ করেছে। চক্রটির মূল চালিকাশক্তি রাওয়া মাজিদ সুইডেন ও তুরস্ক ছেড়ে পালিয়ে বর্তমানে ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থান করছেন। পশ্চিমা ও স্থানীয় গোয়েন্দা সাংবাদিকদের মতে, তেহরানে স্বাধীনভাবে অবস্থান করার বিনিময়ে রাওয়া মাজিদ ও তার দল সেখানে ক্ষমতার সাথে এক গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। সেই সমঝোতা অনুযায়ী, ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের তরুণ সদস্যদের ব্যবহার করে ইউরোপের মাটিতে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক শত্রু, ভিন্নমতাবলম্বী এবং ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হয়। যুক্তরাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই ২০২৫ সালের এপ্রিলে এই নেটওয়ার্ক এবং এর শীর্ষ পলাতক প্রধান রাওয়া মাজিদের ওপর আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
ইউরোপের জননিরাপত্তা রক্ষা এবং কিশোরদের ঘাতক বানানোর এই বীভৎস প্রক্রিয়া থামাতে গঠন করা হয়েছে যৌথ ওটিএফ গ্রিম বা ইউরোপোলের বিশেষ টাস্কফোর্স। যে সব দেশ এই মারাত্মক “ভায়োলেন্স-অ্যাজ-এ-সার্ভিস” বা ভাড়াটে অপরাধ প্রথায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা একত্রিত হয়ে এই অপারেশনে যুক্ত হয়েছে। বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্যের মতো ১১টি পরাশক্তি এখন জোটবদ্ধ হয়ে অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে কাজ করছে। ওটিএফ গ্রিমের আন্তর্জাতিক অভিযানের কারণে গত ১৫ মাসে ২৮০ জনেরও বেশি বিপজ্জনক সদস্য ও ঘাতককে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। একই সাথে নেটওয়ার্কটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নির্দেশক, যেমন ‘এজেন্ট ৪৭’ খ্যাত আলি শেহাদ আহমেদকে ইরাকের সুলাইমানিয়াহ থেকে ও মোহাম্মদ মোহধিকে তিউনিসিয়া থেকে আটক করা গেছে।
তবে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ গ্রেফতারের পরও এই বৈশ্বিক সংকটের শঙ্কা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। সুদূর তেহরানে বসেই রাওয়া মাজিদের মতো মাস্টারমাইন্ডরা একের পর এক কম বয়সী তরুণকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রলোভনে বন্দি করে চলেছে। ফক্সট্রটের পাশাপাশি ‘ডালেন নেটওয়ার্ক’-এর মতো অন্যান্য অপরাধী গ্রুপগুলোও দ্রুত এই কম খরচে এবং কম ঝুঁকিতে কাজ আউটসোর্স করার ভয়ংকর মডেলটি রপ্ত করে নিয়েছে। ফলে এই হুমকি এখনো খুবই বাস্তব। এটি দ্রুত সুইডেন থেকে সমগ্র স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও উত্তর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং নাটল্যান্ডের ঘটনা দেখিয়েছে যে গত বছর তা যুক্তরাজ্যেও পৌঁছেছিল। তরুণ প্রজন্মকে অপরাধের এই বিষাক্ত ছায়া থেকে বাঁচাতে কেবল আইনি দমননীতি নয়, বরং সামাজিক নজরদারি ও অনলাইন নিরাপত্তার সুদৃঢ় পদক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা