স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হওয়ার দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও এবং নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মাস পার হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর গতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভঙ্গুর অবস্থা, আর্থিক খাতের অরাজকতা এবং রাজনৈতিক অনৈক্য দেশের উন্নয়নকে স্থবির করে রেখেছিল। এর ওপর সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের তাণ্ডব দেশের অভ্যন্তরীণ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে আরও অনিশ্চিত ও জটিল করে তুলেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদের পতনের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পুনর্গঠন অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল এক পথ, যা হুট করে ক্ষমতার পরিবর্তনের মাধ্যমেই সম্ভব নয়।
বিগত ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভের চরম সংকট, দেউলিয়া ব্যাংক খাত এবং বিনিয়োগে চরম আস্থাহীনতার মতো পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ বজায় ছিল। নির্বাচিত নতুন সরকারের আমলেও এসব সংকট নিরসনে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। দেশীয় জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকার মালয়েশিয়া ও মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির কূটনৈতিক সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে এবং অন-শোর গ্যাস উত্তোলন ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এটি বহু বছরের তৈরি করা এক পুঞ্জীভূত সমস্যা হওয়ায় এর রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়।
সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবং উৎপাদনশীল খাত সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদ ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনলেও বিশ্ববাজারের উচ্চ মূল্য এবং টাকার মান কমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত সীমার অনেক ওপরে অবস্থান করছে। এদিকে স্বৈরশাসনের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে রাজস্ব খাত; কর-জিডিপি অনুপাত তলানিতে নামার পাশাপাশি সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা বাধ্য হয়ে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের ক্ষত আরও করুণ রূপ ধারণ করেছে। স্বৈরাচারী আমলে গড়ে ওঠা অলিগার্ক বা ক্রনি ক্যাপিটালিজমের প্রভাবে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যা আর্থিক খাতের আস্থাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। একই সাথে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড কমে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি না হওয়া এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর দুর্বল সুশাসনের কারণে শিল্পায়নের সিংহভাগ দায় এখনো দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপরই চেপে আছে। এ ছাড়া বিদেশি মুদ্রার অস্থিরতায় রফতানি আয় ও আমদানিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য রক্ষায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের বৃত্তে থমকে থাকার মূল কারণ উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। জ্বালানি সংকটে দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছে, যার ফলে গত দুই বছরে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এই কর্মসংস্থানহীনতা শ্রমবাজারে নতুন প্রবেশ করা বিপুল বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য এক অশনি সংকেত। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে ২৬ লাখের বেশি বেকার থাকলেও গত এক দশকে শ্রমবাজারে আসা ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের মধ্যে প্রায় ৫৩ লাখই কাজের সুযোগ পাননি। এই বেকারত্ব তরুণদের জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুযোগ হাতছাড়া করে সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়ে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে প্রাথমিক স্থিতিশীলতায় ফেরাতেই অন্তত দুই বছর সময় লেগে যাবে। বিদায়ী স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল দেনা শোধ করতে গিয়েই সরকারের বড় তহবিল ফুরিয়ে যাচ্ছে, যার মধ্যে কেবল বিদ্যুৎ খাতেই বকেয়া পাওনা জমেছিল ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা। উপরন্তু, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ঋণের সুদের বিশাল বোঝা। বিগত সরকারের সময়ে সরকারের মোট ঋণ ১৯ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা থাকলেও বর্তমানে তা চড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকায়, যা আগামী তিন বছরের মধ্যে ৩৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে। বিশাল পরিমাণ ঋণের কিস্তি ও সুদ মেটাতে গিয়ে সরকারের উন্নয়ন বাজেটে টান পড়ছে।
আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল (S&P Global) ইতোমধ্যেই ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ ধারায় নামিয়ে এনেছে। তারা সতর্ক করেছে যে আগামী তিন বছর প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৪ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের এই অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং অবকাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় গণ-অভ্যুত্থানের পর অর্জিত রাজনৈতিক সম্ভাবনা ও নাগরিক অধিকার দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা