শিরোনামঃ
বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪১ পূর্বাহ্ন

শেখ হাসিনা যেভাবে পালিয়েছিলেন

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ও অদম্য গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে বাধ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। তবে একক কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত কিংবা একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের ওপর নির্ভর করে সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর পতন ঘটেনি। বরং ৫ আগস্টের চূড়ান্ত পরিণতি অর্জিত হওয়ার পূর্ববর্তী ৭২ ঘণ্টায় সামরিক বাহিনী, রাজপথ, গণভবন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অন্দরমহলে অতি দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্তের সমীকরণ। ৩ থেকে ৫ আগস্ট—এই তিন দিন ধরে চলা একের পর এক গোপন আলোচনা, সামরিক নেতৃত্বের পেশাদার অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতার ওপর বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়নে স্পষ্ট হতে থাকে আওয়ামী লীগ শাসনের শেষ অধ্যায়।

জুলাইয়ের শুরু থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকারের রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের ফলে সার্বজনীন গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। এ অবস্থায় সেনা কর্মকর্তাদের প্রকৃত মনোভাব ও অবস্থান জানতে ৩ আগস্ট তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরে দরবার আহ্বান করেন। দরবারে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট বক্তব্যে উঠে আসে যে, রাষ্ট্রের স্বজন ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর কোনোভাবেই প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র বা এপিসির ভারী ক্যালাইবার ব্যবহার করা যাবে না। সামরিক বাহিনী প্রত্যক্ষভাবে স্পষ্ট করে যে তারা নিজেদেরই জনগণের মুখোমুখি দাঁড়াবে না। এই ঐতিহাসিক দরবারের পরেই মূলত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। সাবেক সামরিক কর্মকর্তারাও ততক্ষণে আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে রাস্তায় নেমে আসেন, যা সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরাট প্রভাব ফেলে।

৪ আগস্ট দিবাগত রাতেই সামরিক ও গোয়েন্দা শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন যে গণভবনের টিকে থাকার সময় শেষ হয়ে এসেছে। তবুও ক্ষমতা ধরে রাখতে বিকল্প সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। ৪ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে দলীয় জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, নেতা এবং গোয়েন্দা প্রধানদের নিয়ে একাধিক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত নেতাদের একাংশ কীভাবে অস্ত্র ও কঠোর শক্তি প্রয়োগ করে এই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নস্যাৎ করা যায়, তার নানা ধরনের প্রস্তাব তুলে ধরছিলেন। রাত বাড়ার সাথে সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে গণভবনের দোতলা ও নিচতলায় দুটি ভিন্ন বৈঠক হয়, যেখানে সারা দেশে কারফিউ কিংবা কঠোর ‘লকডাউন’ বলবৎ করার পরিকল্পনাও নিয়ে আলোচনা করা হয়।

ওই রাতে সেনাপ্রধান সেনাসদরে বৈঠকে বসার পূর্বেই শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানার সাথে একান্ত সাক্ষাৎ করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় শেখ হাসিনাকে সময় না থাকার বাস্তবতা জানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জরুরি সমঝোতায় যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেন। অপরদিকে রাজনৈতিক স্তরেও পদত্যাগের একটি বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছিল। ৪ আগস্ট বিকেলে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক প্রভাবশালী পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করার পর সালমান এফ রহমানসহ অন্য নেতাদের নিয়ে গণভবনে যান। তাঁদের অনানুষ্ঠানিক খসড়া ভাবনা ছিল—শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন, যিনি পরবর্তীতে জাতীয় সরকার গঠন করে একটি অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু ততক্ষণে রাজপথের গণবিস্ফোরণ সেই প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগগুলো নস্যাৎ করে দেয়।

৫ আগস্ট ভোরে উত্তরা, সাভার, গাজীপুর ও যাত্রাবাড়ী—ঢাকার প্রতিটি প্রবেশমুখ দিয়ে লাখ লাখ ছাত্র-জনতার ঢল শহরের কেন্দ্রঞ্চলের দিকে ধাবিত হতে থাকে। সকাল ১০টায় বিমর্ষ শেখ হাসিনা পুনারায় সেনাপ্রধানকে গণভবনে ডেকে পাঠান। সেনাপ্রধানের কাছে তিনি নিজের প্রস্তুত করা পদত্যাগপত্র তুলে ধরেন। পদত্যাগের সিদ্ধান্তের পর সেনাপ্রধান অবিলম্বে সেনাসদরে ফিরে আসেন এবং ডিজিএফআইয়ের মাধ্যমে তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সেনা সদরে আসার বার্তা পাঠান, যেন ক্ষমতার স্থানান্তরে বড় কোনো চরম অরাজকতা না তৈরি হয়। তবে পদত্যাগের পরবর্তী পদক্ষেপ কিংবা নিরাপত্তার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সুনির্দিষ্ট নীল নকশা শেখ হাসিনার ছিল না। তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং ভারতের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের কাছে সাময়িকভাবে যাওয়ার ছাড়পত্র নিশ্চিত করেন।

শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাথে সামরিক শীর্ষ কর্তাদের টেলিকনফারেন্সও এ সময় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির প্রাক্কালে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা জয়কে বাস্তব পরিস্থিতি বর্ণনা করে জানান যে, শেখ হাসিনাকে জীবিত রক্ষা করার একমাত্র উপায় অবিলম্বে পদত্যাগ ও দেশত্যাগ করা। জয়ের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে রাজপথের চূড়ান্ত হিংস্রতার হাত থেকে বাঁচাতে সক্ষম হয় পরিবার ও শীর্ষ মহল।

৫ আগস্ট দুপুর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা গণভবনের পেছনের অংশ থেকে একটি হেলিকপ্টারে চড়ে কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখানে সামরিক লাউঞ্জে এক ঘণ্টারও বেশি সময় অবস্থানের পর বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ সি-১৩০ পরিবহন বিমানে করে তাঁরা দেশ ছাড়েন। বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিটে দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমান ঘাঁটিতে বিমানটি অবতরণ করলে ভারতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। শেখ হাসিনা যখন বিমানে ওঠেন, সেই সময়ও গণভবন থেকে তড়িঘড়ি সরে যাওয়া অনেক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বা দলীয় নেতা বিষয়টি টের পাননি। দলীয় ও প্রশাসনিক প্রধানদের কোনো স্পষ্ট বার্তা না দেওয়ায় আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যান কিংবা সাধারণ মাস্ক পরে ছাত্র-জনতার ভিড়ের মধ্যে আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হন।

পরিশেষে, শেখ হাসিনার এই আকস্মিক ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগ কোনো একক দিনের আবেগপ্রবণ গণজমায়েতের ফল ছিল না। এটি ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক একচ্ছত্র অবস্থান, জনগণের পালস বুঝতে না পারা, মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নীতি এবং সময়মত উদ্ভূত সংকট অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ার এক অনিবার্য ঐতিহাসিক পরিণতি। সামরিক বাহিনী জনগণের বুক থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলে রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল ভিত্তি ভেঙে পড়ে এবং অবশেষে শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমাপ্তি ঘটে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


এ জাতীয় আরো খবর...