সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৪৭ অপরাহ্ন

৪২ খেলাপির অর্থ ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

বিগত প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংক খাত থেকে লুটে নেওয়া দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও পাচার হওয়া সম্পত্তি দেশে ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শীর্ষ ১১টি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর পর এবার দুই শত কোটি টাকার বেশি খেলাপির খাতায় নাম লেখানো আরও ৪২টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পত্তি উদ্ধার ও বাজেয়াপ্ত করার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পাচারকৃত অর্থ শনাক্ত এবং তা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সহজতর করতে বিশ্বখ্যাত আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা ৩৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সাথে এক জরুরি বৈঠক করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, যেখানে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত উক্ত পর্যালোচনা সভায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নির্দেশ দেওয়া হয় যেন তারা অনতিব্লিমে নির্ধারিত বৈশ্বিক পরামর্শক সংস্থাগুলোর সাথে ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ বা এনডিএ স্বাক্ষর সম্পন্ন করেন। মূলত বৈশ্বিক প্রক্রিয়ায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ ১২টি চিহ্নিত দেশে পাচার হওয়া অর্থ ও বেনামী সম্পত্তি উদ্ধারে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। পুরো অর্থ উদ্ধার অভিযানটি পরিচালিত হবে ‘নো উইন, নো পে’ (No Win, No Pay) নীতির আওতায়, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থাগুলো তাদের নিজস্ব অর্থ ও প্রযুক্তিতে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত করবে এবং কেবল উদ্ধারকৃত অর্থ থেকে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ বা ফি গ্রহণ করবে। ফলে এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপে দেশীয় ব্যাংকগুলোকে কোনো ধরনের অগ্রিম অর্থ প্রদান করতে হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত আটটি বৈশ্বিক সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব অর্পণের প্রক্রিয়া চলছে, যার মধ্যে গ্র্যান্ট থর্নটন, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রোল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস এবং রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথের মতো শীর্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা রয়েছে। ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপি হওয়া ৪২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক উন্মোচন এবং স্থানীয় আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রথমে সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও পরবর্তী সময়ে আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশে তা দেশে ফেরানোর কাজ করবে এই আইনি সংস্থাগুলো। পূর্বে দেওয়া নির্দেশনার ভিত্তিতে কোন কোন ব্যাংক ইতিপূর্বে চুক্তি সম্পাদন করেছে, বৈঠকে সেসবের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয় এবং পিছিয়ে থাকা ব্যাংকগুলোকে গভর্নর অতি দ্রুত চুক্তি শেষ করার নির্দেশ দেন।
সংবাদমাধ্যমের সাথে আলাপকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান যে, পাচারকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ ফিরিয়ে আনাই বর্তমান গভর্নরের প্রধান অগ্রাধিকার। প্রথম ধাপে ১১টি বৃহৎ খেলাপির তথ্য বের করার পর এখন দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪২টি শীর্ষ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা ধরে তদন্ত আগাচ্ছে। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে বিভিন্ন জালিয়াতি ও বেনামী ঋণের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছিল, যার ফলে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, ২০০৯ থেকে পরবর্তী ১৫ বছরে প্রায় ২৮টি অভিনব কৌশলে দেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৯ লাখ কোটি টাকা) বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গভর্নরের এই কড়া বার্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থাকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তটি খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন পরিবেশ তৈরি করবে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনের সঠিক ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার এই সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে তা ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের লুটেরাদের বড় ধরনের বার্তা দেবে। ব্যাংকগুলোর অনাদায়ী অর্থ পুনরুদ্ধারের এই বৈশ্বিক আইনি লড়াই সফল হলে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...